স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে মারধর, ৬ কর্মকর্তাসহ ১১ পুলিশ সদস্য বরখাস্ত

রংপুরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে মারধরের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পুলিশের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা। ঘটনায় তদন্ত শেষে ছয় কর্মকর্তাসহ মোট ১১ জন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি)। বিষয়টি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ঘটনার পটভূমি ও বরখাস্তের সিদ্ধান্ত

গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাত সাড়ে ১১টার দিকে রংপুর মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান স্বাক্ষরিত এক আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। বরখাস্তকৃতদের মধ্যে রয়েছেন ছয়জন উপ-পরিদর্শক ও সহকারী উপ-পরিদর্শক এবং পাঁচজন কনস্টেবল।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, অদক্ষতা, অপেশাদার আচরণ ও অসদাচরণের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সরকারি চাকরি আইন ২০১৮ অনুযায়ী তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

কী ঘটেছিল সেই দিন

ঘটনার সূত্রপাত হয় রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি থানায়। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, ৩ জুন থানায় পালিয়ে বিয়ে করা এক তরুণ-তরুণীকে নিয়ে আনা হলে সেখানে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা রাকিবুজ্জামান রাকিব হস্তক্ষেপ করলে তাকে মারধর করা হয়।

পরবর্তীতে বিষয়টি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এরপরই ঘটনাটি তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে পুলিশ প্রশাসন।

তদন্তে কী পাওয়া গেছে

তদন্ত কমিটি সিসিটিভি ফুটেজ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অন্যান্য নথিপত্র বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু পুলিশ সদস্যের আচরণে দায়িত্বহীনতা ও অপেশাদার মনোভাব স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

এতে আরও উল্লেখ করা হয়, ঘটনাটির কারণে ভুক্তভোগীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পাশাপাশি ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রচারের ফলে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পুলিশ প্রশাসনের অবস্থান

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার জানিয়েছেন, বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা বা আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযোগে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের সাময়িকভাবে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং তারা বিধি অনুযায়ী খোরপোষ ভাতা পাবেন।

রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট

এই ঘটনা ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের আচরণ নিয়ে আগেও বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। ফলে সাম্প্রতিক এই সিদ্ধান্তকে অনেকে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ হিসেবে দেখলেও, কেউ কেউ বিষয়টিকে বৃহত্তর প্রশাসনিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা হিসেবে উল্লেখ করছেন।

মানবাধিকার কর্মীদের মতে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হলে জনগণের আস্থা বাড়বে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা কমে আসবে।

উপসংহার

রংপুরের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশ প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে পুরো ঘটনার স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণই এখন মূল বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে।

Source: Based on reporting from Naya Diganta

Next News Previous News