কী রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চুক্তিতে?
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে একটি দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত ও কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম BBC News। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তার বরাতে প্রকাশিত এই তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বাঁ-এ অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।
কারা স্বাক্ষর করলেন
রিপোর্ট অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট Masoud Pezeshkian চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ট্রাম্প প্রশাসন এটিকে ‘পারফরম্যান্স-ভিত্তিক’ বা শর্তসাপেক্ষ সমঝোতা হিসেবে উল্লেখ করছে।
চুক্তির মূল কাঠামো
১৪ দফা এই সমঝোতা স্মারকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শর্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বাণিজ্য পথ পুনরায় চালুর বিষয় রয়েছে।
১. সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি
চুক্তির প্রথম ধাপে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্ররা ‘সব ফ্রন্টে’ অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করবে। এর মধ্যে লেবাননসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাত অন্তর্ভুক্ত।
২. সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান
দুই দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা সম্মান করবে এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে।
৩. আলোচনার সময়সীমা
চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা পারস্পরিক সম্মতিতে বাড়ানো যেতে পারে।
৪. অবরোধ প্রত্যাহার
চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর ও নৌপথে আরোপিত অবরোধ ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করবে। ৩০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ অবরোধ তুলে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
৫. হরমুজ প্রণালি
ইরানকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে এবং কোনো ধরনের অতিরিক্ত ফি ছাড়াই চলাচল স্বাভাবিক করতে হবে।
৬. পুনর্গঠন তহবিল
ইরানের উন্নয়ন ও পুনর্গঠনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অংশীদাররা ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের পরিকল্পনা করবে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র এতে সরাসরি অর্থ দেবে না।
৭. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে, যার মধ্যে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাও অন্তর্ভুক্ত।
৮. পারমাণবিক প্রতিশ্রুতি
ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন বা উন্নয়ন করবে না বলে সম্মত হয়েছে। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর তত্ত্বাবধানে থাকবে।
৯-১০. বর্তমান পরিস্থিতি
চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত পারমাণবিক কর্মসূচি ‘স্ট্যাটাস কো’ অবস্থায় থাকবে এবং নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে না।
১১. জব্দ অর্থ মুক্ত করা
ইরানের আটকে থাকা অর্থ ধাপে ধাপে মুক্ত করা হবে, যা শর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করবে।
১২-১৪. নজরদারি ও ভবিষ্যৎ আলোচনা
চুক্তি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য একটি যৌথ কাঠামো গঠন করা হবে। পরবর্তীতে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য নতুন আলোচনা শুরু হবে, যা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন সাপেক্ষে কার্যকর হবে।
বিশ্লেষণ
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের বিস্তৃত সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির স্থিতিশীলতা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
তবে অনেক বিষয় এখনো অনির্ধারিত থাকায় চুক্তির বাস্তবায়ন ও স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
উপসংহার
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান এই ১৪ দফা সমঝোতা স্মারককে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন, আস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।
Source: Based on reporting from BBC News and White House briefing statements
