চাকরির জন্য তরুণদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না: সংসদে প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশের তরুণদের দীর্ঘদিন চাকরির জন্য অপেক্ষা করতে হবে না—এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতের বাংলাদেশে তরুণরা শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, বরং উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।

সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে তিনি দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কৌশল তুলে ধরেন।

অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক অঙ্গীকার

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বাস্তব এবং সরকার তা অস্বীকার করছে না। তবে সংকটকে কোনো অজুহাত হিসেবে ব্যবহার না করে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর নীতি এবং জনগণের সহযোগিতার মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হবে।

তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যমূল্যের অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়েছে। তবুও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টার কথাও তিনি তুলে ধরেন।

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের লক্ষ্য কী?

‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ শিরোনামে উপস্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে প্রধানমন্ত্রী দেশের অর্থনীতির নতুন রূপকল্প হিসেবে বর্ণনা করেন। তার মতে, এই বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং অর্থনীতিকে আরও অংশগ্রহণমূলক ও উৎপাদনমুখী করার একটি পরিকল্পনা।

তিনি জানান, মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ ৫০ শতাংশের বেশি বাড়িয়ে ৩ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে, যাতে বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হলো সেটির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই প্রকল্প মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কতটা ভূমিকা রাখছে।

তিন ধাপে অর্থনৈতিক সংস্কারের পরিকল্পনা

সরকারের অর্থনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নের জন্য তিনটি ধাপ নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। প্রথম ধাপে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং নিম্নআয়ের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

দ্বিতীয় ধাপে রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন এবং রপ্তানি খাতকে বহুমুখী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। আর তৃতীয় ধাপে উদ্ভাবন, উৎপাদনশীলতা এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলা হবে।

তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের দিগন্ত

প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি আসে এবং তরুণরা তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পায়। তিনি এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলার কথা বলেন, যা ঋণনির্ভর না হয়ে উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনের ওপর নির্ভরশীল হবে।

তার মতে, দেশীয় শিল্পের বিকাশ, বন্ধ বা রুগ্ন শিল্পকারখানার পুনরুজ্জীবন এবং নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। একই সঙ্গে উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে তরুণদের আত্মকর্মসংস্থানের পথও প্রশস্ত হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের প্রত্যাশা

অর্থনীতিবিদদের মতে, কর্মসংস্থানমুখী উন্নয়ন কৌশল বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, শিল্প ও রপ্তানিমুখী খাতে বিনিয়োগ বাড়লে নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হতে পারে।

সরকারের পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে আগামী বছরগুলোতে কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র: জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত।

Next News Previous News