পাহাড় কাঁপল, ক্যাম্প কাঁপল, নড়ল না শুধু গোয়েন্দারা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে র‍্যাব ও পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলার ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশের পাহাড়ি অঞ্চলের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তৎপরতার সক্ষমতা। হামলার পর নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী হামলা নয়; বরং পরিকল্পিত ও সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে গোয়েন্দা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে।

রোববার দিবাগত রাতে সংঘটিত এ ঘটনায় র‍্যাব ও পুলিশের দুটি ক্যাম্প লক্ষ্য করে একযোগে গুলিবর্ষণ করা হয়। হামলার জন্য ‘ইয়াসিন বাহিনী’কে দায়ী করছে র‍্যাব। তবে ঘটনার প্রায় একদিন পরও হামলাকারীদের কাউকে আটক বা অস্ত্র উদ্ধার করতে না পারায় প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

রাস্তা কেটে বিচ্ছিন্ন করা হয় এলাকা

নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, হামলার আগে রাতভর অন্তত পাঁচটি স্থানে এস্কেভেটর দিয়ে রাস্তা কেটে ফেলা হয়। এতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত বাহিনী ও যানবাহন পৌঁছাতে বিলম্ব হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রস্তুতি তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া সম্ভব নয়। পাহাড়ি এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার, একাধিক রুট বিচ্ছিন্ন করা এবং সমন্বিত হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে দীর্ঘ সময়ের প্রস্তুতি ও স্থানীয় সমর্থন প্রয়োজন হয়।

র‍্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান জানান, রাত ১টার পর হামলা শুরু হয় এবং একই সময়ে র‍্যাব ও পুলিশ ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়।

গোয়েন্দা ব্যর্থতার অভিযোগ

ঘটনার পর নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ গোয়েন্দা নজরদারির ঘাটতির বিষয়টি সামনে আনছেন। তাদের মতে, এত বড় আকারের প্রস্তুতির পরও আগাম কোনো সতর্কবার্তা না পাওয়া উদ্বেগজনক।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যর্থতা তিনটি পর্যায়ে দেখা গেছে—ঘটনার আগে, হামলার সময় এবং হামলার পরে।

প্রথমত, হামলার আগে রাস্তা কাটা, অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা এবং পাহাড়ি এলাকায় ভারী যন্ত্র চলাচলের মতো বিষয়গুলো নজরে আসেনি। দ্বিতীয়ত, হামলার সময় দ্রুত সমন্বয় ও প্রতিরোধে বিলম্ব হয়েছে। আর তৃতীয়ত, ঘটনার পর হামলাকারীদের পালানোর পথ বা ব্যবহৃত অস্ত্র সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য এখনো মেলেনি।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. এম শাহীদুজ্জামান বলেন, এ ধরনের ত্রিমুখী হামলার জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি, মানচিত্রভিত্তিক পরিকল্পনা ও যোগাযোগ সমন্বয় প্রয়োজন হয়। তার মতে, এটি আকস্মিক সহিংসতা নয়, বরং সংগঠিত অভিযানের লক্ষণ।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, রাস্তা কেটে ফেলা, বিকল্প পালানোর পথ তৈরি এবং অবস্থান পরিবর্তন করে গুলি চালানো গেরিলা কৌশলের অংশ। তার মতে, গোয়েন্দা নজরদারি শক্তিশালী হলে এ ধরনের প্রস্তুতি পুরোপুরি অদৃশ্য থাকার কথা নয়।

একজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, এত দীর্ঘ সময় গুলিবিনিময়ের পরও কোনো অস্ত্র বা গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার না হওয়া উদ্বেগজনক। এতে বোঝা যায়, হামলাকারীরা পরিকল্পিতভাবে এলাকা ত্যাগ করেছে।

স্থানীয়দের আতঙ্ক ও প্রশ্ন

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হামলার আগের রাতেই পাহাড় কাটার শব্দ শুনেছিলেন তারা। কেউ কেউ কয়েকদিন ধরে অপরিচিত লোকজনের চলাচল এবং রাতে মোটরসাইকেলের আনাগোনার কথাও বলেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা রাবেহা বেগম বলেন, “রাত দুইটার দিকে পাহাড় কাটার শব্দ শুনেছি। এত বড় যন্ত্র চলল, কিন্তু কেউ কিছু জানল না?”

এলাকার কয়েকজন দোকানদারও জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে নতুন মুখের মানুষের উপস্থিতি তাদের নজরে এসেছিল।

সলিমপুর কেন স্পর্শকাতর

জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড়ি সন্ত্রাসী কার্যক্রম, অবৈধ দখল ও অপরাধচক্রের কারণে আলোচনায় রয়েছে। সরকারি খাসজমিতে গড়ে ওঠা অবৈধ বসতি এবং পাহাড় কেটে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে বহুদিনের।

সরকার সেখানে কারাগার, আইটি পার্কসহ একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলেও জমি পুনরুদ্ধার ও নিরাপত্তা সংকটের কারণে অনেক প্রকল্প আটকে আছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই সম্প্রতি সেখানে র‍্যাব ও পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল।

নজরদারি জোরদারের তাগিদ

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেছেন, হামলার আগে পরিকল্পিতভাবে রাস্তা কেটে ফেলা হয়েছিল, যা বাহিনীর চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। তবে দ্রুত অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, পাহাড়ি এলাকায় নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলে কার্যকর গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক, স্থানীয় তথ্যদাতা ব্যবস্থা এবং আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তির সমন্বয় ছাড়া ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

Source: Based on reporting from আমার দেশ

Next News Previous News