রাশিয়া-চীনের সাহায্যে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলকে কোণঠাসা করছে ইরান
মধ্যপ্রাচ্যের নতুন যুদ্ধ: ট্যাংক নয়, নির্ধারণ করছে রাডার, স্যাটেলাইট ও গোপন তথ্য
মধ্যপ্রাচ্যে এখন যে যুদ্ধ চলছে তা আগের যেকোনো যুদ্ধের চেয়ে আলাদা। এখানে সামনের সারি নেই। ট্যাংক বা মিসাইলের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে রাডার, স্যাটেলাইট ও গোপন গোয়েন্দা তথ্য।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে এই তথ্য দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তবে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে রাশিয়ার হিসাব বোঝা কঠিন নয়।
ইরান রাশিয়াকে ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ড্রোন ও গোলাবারুদ দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে দিয়েছে রুশ অবস্থানে হামলার লক্ষ্যনির্ধারণী গোয়েন্দা তথ্য। ফলে পুতিনও এখন গোয়েন্দা তথ্যকে কার্যত যুদ্ধের এক ধরনের মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করছেন।
“আধুনিক যুদ্ধে সমন্বয় তথ্য প্রায়ই গুলির চেয়ে বেশি মূল্যবান।”
এই মন্তব্য করেছিলেন সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা ব্রুস রিডেল। বর্তমান উপসাগরীয় সংঘাতে এই কথাই বাস্তব হয়ে উঠছে।
ইরানের নিজস্ব সামরিক স্যাটেলাইট খুবই সীমিত। খোলা সমুদ্রে দ্রুতগামী জাহাজ ট্র্যাক করার ক্ষমতাও তাদের নেই। কিন্তু রাশিয়ার কাছে সেই সীমাবদ্ধতা নেই। রাশিয়ার কানোপুস-ভি স্যাটেলাইট ইরানের ব্যবহারের জন্য খাইয়াম নামে দেওয়া হয়েছে।
এই স্যাটেলাইট দিনরাত অপটিক্যাল ও রাডার ছবি দিতে পারে এবং ইরানের নির্ভুল হামলার পুরো ব্যবস্থাই অনেকাংশে এই তথ্যের উপর নির্ভরশীল।
সম্প্রতি কুয়েতে একটি মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের ড্রোন হামলায় ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হন। পেন্টাগনের কর্মকর্তারা বেনামে জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বেশ কিছু ইরানি হামলা এমন স্থানে হয়েছে যেগুলোর স্থানাংক কোনো প্রকাশ্য মানচিত্রে নেই।
এদিকে চীনের ভূমিকাও নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। চীন ইরানের সামরিক নেভিগেশনকে মার্কিন জিপিএস থেকে নিজেদের বেইডু-৩ স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থায় স্থানান্তর করেছে।
চীন আরও সরবরাহ করেছে উন্নত ওয়াইএলসি-৮বি অ্যান্টি-স্টেলথ রাডার, যা নিম্ন-কম্পাংক তরঙ্গ ব্যবহার করে এবং মার্কিন স্টেলথ বিমানের রাডার-শোষণকারী আবরণকে অনেকটাই অকার্যকর করে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বি-২১ রেইডার ও এফ-৩৫সি স্টেলথ যুদ্ধবিমান অদৃশ্য থাকার জন্য তৈরি হলেও এই ধরনের রাডারের সামনে তারা তুলনামূলকভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে।
রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান প্রায় ৫০টি চীনা সিএম-৩০২ সুপারসোনিক জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কেনার কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মাক-৩ গতিতে ছুটতে পারে এবং সামরিক বিশ্লেষকদের কাছে এগুলো পরিচিত ‘ক্যারিয়ার কিলার’ নামে।
এর ফলে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এখন এই ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের পরিধিতে রয়েছে।
যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দ্রুত ইরানের রাডার অবকাঠামো ধ্বংস করেছিল। সাবেক ইসরাইলি বিমানবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল এইতান বেন-এলিয়াহু বলেছেন, রাডার ধ্বংস করা মানে শুধু যন্ত্র নষ্ট করা নয়—এটা শত্রুকে কার্যত অন্ধ করে দেওয়া।
তবে ইরানের আইআরজিসির মুখপাত্র আলি মোহাম্মাদ নায়েনি দাবি করেছেন, ইরান পুরো অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর প্রায় ১০টি উন্নত রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে।
দশকের পর দশক ধরে আরব উপসাগরীয় অঞ্চল ছিল মার্কিন-ইসরাইলি প্রযুক্তিগত আধিপত্যের মঞ্চ। কিন্তু চীনের প্রযুক্তি সরবরাহ এবং রাশিয়ার গোয়েন্দা সহায়তার ফলে এই আধিপত্য ধীরে ধীরে ক্ষয় পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগর এখন এমন এক রণক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে যেখানে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রচলিত অস্ত্রের চেয়েও বেশি নির্ধারক হতে পারে।
রাশিয়া ও চীন সরাসরি সেনা পাঠাচ্ছে না। কিন্তু তারা ইরানকে আরও কার্যকরভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করতে শেখাচ্ছে।
এই সংকেত যুদ্ধে রাডার তরঙ্গ এখন মিসাইলের মতোই মারাত্মক। গোয়েন্দা তথ্যই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।
