হযরত শাহজালাল মাজারের আয়-ব্যয়ের কোনো হিসfব নেই: ডিসি সারওয়ার আলম
সিলেটের ঐতিহাসিক হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দান-অনুদানের আয় ও ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে জেলা প্রশাসন। দীর্ঘদিন ধরে দেশ-বিদেশের মানুষের দান, মানত ও আর্থিক সহযোগিতায় পরিচালিত এই মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিয়েছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম।
শুক্রবার (১২ জুন) মাজার পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জেলা প্রশাসক বলেন, মাজার একটি জনসম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এর আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব সংরক্ষণ জরুরি। তিনি অভিযোগ করেন, এতদিন পর্যন্ত মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত নথিপত্র ও হিসাব পাওয়া যায়নি।
দান-অনুদানের অর্থ নিয়ে স্বচ্ছতার উদ্যোগ
হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ আসেন। অনেকেই মানত হিসেবে নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার, গরু-ছাগলসহ বিভিন্ন সামগ্রী দান করেন। কিন্তু এসব সম্পদের প্রকৃত আয় ও ব্যবহার সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট তথ্য না থাকায় দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা ছিল।
জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম বলেন, কিছু ব্যক্তি মাজারের আয় সংগ্রহ করে নিজেদের মতো করে খরচ করেন—এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার মতে, এটি একটি জনসম্পত্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়, তাই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে অর্থ ব্যয়ের সুযোগ নেই।
প্রায় ৩০ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন
জেলা প্রশাসক জানান, মাজার এলাকায় সরকারি অর্থায়নে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। এর মধ্যে সরকার ২৫ কোটি টাকা দেওয়ার কথা রয়েছে এবং বাকি ৫ কোটি টাকা মাজার কর্তৃপক্ষের দেওয়ার কথা ছিল।
তিনি বলেন, মাজার কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত পুরো অর্থ দিতে পারেনি। পাঁচ কোটি টাকার মধ্যে তিন কোটি টাকা সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে, তবে বাকি দুই কোটি টাকার বিষয়ে জটিলতা রয়েছে। এ কারণে পরিকল্পনা কমিশন থেকেও মাজারের আয়-ব্যয়ের উৎস সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে।
মোতোয়াল্লির বক্তব্য
মাজারের মোতোয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান বলেন, দানের অর্থের কোনো নির্দিষ্ট মাসিক পরিসংখ্যান নেই, কারণ আয় সবসময় এক রকম থাকে না। তিনি জানান, এই অর্থ দিয়ে মাজারের বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল এবং কর্মচারীদের বেতনসহ বিভিন্ন খরচ পরিচালনা করা হয়।
তিনি স্বীকার করেন, দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই মাজারের ব্যবস্থাপনা চলে আসছে। তবে আয়-ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ধর্মীয় ও সামাজিক মহলের প্রতিক্রিয়া
সিলেট মহানগর ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা হাবিব আহমদ শিহাব বলেন, হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার সিলেটের ঐতিহ্য ও পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানুষের দান-অনুদান সঠিকভাবে ব্যবহারের জন্য স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শরিয়তের দৃষ্টিতেও দান-খয়রাতের অর্থ সঠিক খাতে ব্যয় করা গুরুত্বপূর্ণ। জেলা প্রশাসকের উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানিয়ে বলেন, সাধারণ মানুষও এই ধরনের স্বচ্ছতা চায়।
‘ইসলামিক কমপ্লেক্স’ গড়ার পরিকল্পনা
জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, মাজার, মসজিদ ও মাদ্রাসাকে সমন্বিতভাবে একটি আধুনিক ইসলামিক কমপ্লেক্স হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষা, ব্যবস্থাপনা ও সেবামূলক কার্যক্রম আরও উন্নত করার লক্ষ্য রয়েছে বলে তিনি জানান।
উপসংহার
হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশাসনের এই উদ্যোগ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার প্রশ্নকে সামনে এনেছে। এখন নিয়মিত হিসাব সংরক্ষণ ও জনসাধারণের আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বড় চ্যালেঞ্জ।
Source: Based on reporting from Ittefaq
