আসামি মারা গেলে অর্থ পরিশোধ করবে কে?

মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর অনেকের মনে একটি সাধারণ প্রশ্ন দেখা দেয়—আসামি যদি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন, তাহলে আদালতের নির্দেশিত অর্থদণ্ড বা ক্ষতিপূরণ আদায় কীভাবে হবে? সম্প্রতি আলোচিত রমিসা হত্যা মামলার রায়কে কেন্দ্র করে বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফৌজদারি আইনে অর্থদণ্ড শুধু শাস্তি নয়, বরং ভুক্তভোগীর জন্য আর্থিক প্রতিকার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা।

রমিসা হত্যা মামলায় আদালতের রায়

ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল রমিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানাকে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং সহ-আসামি স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড ও ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেন।

আদালত একই সঙ্গে নির্দেশ দেন, আসামিদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থদণ্ডের টাকা আদায় করে ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এই নির্দেশ মামলাটিকে শুধু শাস্তির নয়, বরং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার দৃষ্টান্ত হিসেবেও সামনে এনেছে।

মৃত্যুদণ্ড হলে অর্থদণ্ড আদায় কীভাবে হয়?

বাংলাদেশের ফৌজদারি আইন অনুযায়ী, অর্থদণ্ড একটি অপরাধের জন্য আরোপিত শাস্তি, যা ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড হলেও বাতিল হয়ে যায় না। যদি দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি জীবদ্দশায় অর্থ পরিশোধ না করেন, তাহলে আদালতের নির্দেশে রাষ্ট্র তার সম্পত্তি থেকে তা আদায় করতে পারে।

এই ক্ষেত্রে আদালত সংশ্লিষ্ট আসামির ব্যাংক হিসাব জব্দ করতে পারে, স্থাবর সম্পত্তি (জমি, বাড়ি) এবং অস্থাবর সম্পত্তি (গাড়ি, ব্যবসা) ক্রোক করতে পারে। পরবর্তীতে এসব সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে অর্থদণ্ড আদায় করা হয়।

পরিবার কি অর্থ দিতে বাধ্য?

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ফৌজদারি আইনে আসামির পরিবারের সদস্যরা ব্যক্তিগত সম্পত্তি দিয়ে অর্থদণ্ড পরিশোধ করতে বাধ্য নন। অর্থদণ্ড সম্পূর্ণভাবে অপরাধীর ব্যক্তিগত দায়।

তবে আসামির মৃত্যুর পরও তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে রাষ্ট্র অর্থদণ্ড আদায় করতে পারে, যা উত্তরাধিকার বণ্টনের আগে নিষ্পত্তি করা হয়।

কোন আইনে এই ব্যবস্থা কার্যকর?

বাংলাদেশে কয়েকটি আইনের অধীনে অর্থদণ্ড ও সম্পত্তি জব্দের বিধান রয়েছে।

দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী আদালত মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি অর্থদণ্ড আরোপ করতে পারে। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ অনুযায়ী আদালত সম্পত্তি ক্রোক, নিলাম ও অর্থদণ্ড আদায়ের নির্দেশ দিতে পারে।

এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ অনুযায়ী ধর্ষণ ও হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি অর্থদণ্ড আরোপের বিধান রয়েছে।

রায়ের পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া

বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের রায় চূড়ান্ত হয় না সঙ্গে সঙ্গে। প্রথমে রায় হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স হিসেবে যায়। এরপর হাইকোর্ট রায় অনুমোদন বা পরিবর্তন করতে পারে।

পরবর্তী ধাপে আপিল বিভাগে আপিলের সুযোগ থাকে এবং পরে রিভিউ আবেদন করা যায়। সর্বশেষ ধাপে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। এসব প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত দণ্ড কার্যকর হয় না।

আইন বিশেষজ্ঞদের মত

আইনজ্ঞদের মতে, অর্থদণ্ড শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, বরং এটি ভুক্তভোগীর পরিবারকে আর্থিক ও প্রতীকী ন্যায়বিচার দেওয়ার একটি উপায়। সাম্প্রতিক সময়ে আদালতগুলো শুধু শাস্তির দিকেই নয়, ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার দিকেও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ধরনের রায় বিচারব্যবস্থায় ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক ন্যায়বিচারের ধারণাকে আরও শক্তিশালী করছে।

Source: Based on reporting from সংবাদ প্রতিবেদন

Next News Previous News