উত্তর কোরিয়া সফরে কেন যাচ্ছেন শি চিনপিং?

চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে দেশটির নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করতে যাচ্ছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শি চিনপিংয়ের সীমিত বিদেশ সফরের প্রেক্ষাপটে এই সফরকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি পূর্ব এশিয়ার পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতিও এই সফরের অন্যতম কারণ হতে পারে।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শি চিনপিংয়ের ব্যক্তিগতভাবে পিয়ংইয়ং যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। কারণ গত কয়েক বছরে তিনি খুব কম বিদেশ সফর করেছেন এবং সাধারণত বিভিন্ন দেশের নেতারাই বেইজিংয়ে গিয়ে তার সঙ্গে বৈঠক করেন।

দীর্ঘ বিরতির পর পিয়ংইয়ং সফর

২০১৯ সালের পর এবারই প্রথম উত্তর কোরিয়া সফরে যাচ্ছেন শি চিনপিং। এর আগে ২০২০ ও ২০২১ সালে করোনা মহামারির কারণে তার আন্তর্জাতিক সফর কার্যক্রম অনেকটাই সীমিত ছিল। পরবর্তী বছরগুলোতেও তার বিদেশ সফরের সংখ্যা আগের তুলনায় কমে আসে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তিত কূটনৈতিক ধারা দেখাচ্ছে যে চীন এখন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে। ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াংয়ের মতে, শির এই সফর উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কের গুরুত্ব প্রকাশ করছে।

রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে চীনের ভাবনা

দীর্ঘদিন ধরে উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় মিত্র ও অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পিয়ংইয়ং ও মস্কোর সম্পর্ক দ্রুত ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে সামরিক সরঞ্জাম ও জনবল সহায়তা দিয়েছে। এর বিনিময়ে রাশিয়া পিয়ংইয়ংকে অর্থনৈতিক সহায়তা, সামরিক প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সুবিধা দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, রাশিয়ার কাছ থেকে উত্তর কোরিয়া যদি উন্নত সামরিক প্রযুক্তি পেয়ে যায়, তাহলে কোরীয় উপদ্বীপের শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। বিষয়টি চীনের আঞ্চলিক স্বার্থের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি

সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও সামরিক কার্যক্রম আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে। দেশটি চলতি বছরে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নতুন ধরনের অস্ত্র প্রযুক্তি ও পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে। এসব কার্যক্রমের কারণে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

কোরীয় উপদ্বীপে নতুন সমীকরণ

উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে ১৯৫৩ সালের যুদ্ধবিরতির পরও আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি হয়নি। ফলে দুই দেশ এখনো প্রযুক্তিগতভাবে যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সামরিক উত্তেজনা বজায় আছে।

২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্ব কোরিয়া পুনরেকত্রীকরণের দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়। এরপর দুই কোরিয়ার মধ্যে যোগাযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়ে।

চীন কেন গুরুত্ব দিচ্ছে এই সফরকে

বিশেষজ্ঞদের মতে, শি চিনপিংয়ের সফরের পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে উত্তর কোরিয়া-রাশিয়া সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক প্রভাব, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সামরিক সহযোগিতা এবং পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি।

চীন মনে করে, উত্তর কোরিয়ার অতিরিক্ত সামরিক শক্তি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আবার পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হলেও বেইজিংয়ের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হতে পারে।

সব মিলিয়ে শি চিনপিংয়ের এই সফর শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নয়, বরং পূর্ব এশিয়ার ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক ভারসাম্যের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

Source: Based on reporting from Reuters and the original news report

Next News Previous News