টানা তৃতীয় বছরের মতো কোরবানি হচ্ছে না গাজায়
গবাদি পশুর তীব্র সংকটে টানা তৃতীয় বছরের মতো এবারও ঈদুল আজহায় কোরবানি দিতে পারছেন না গাজার বাসিন্দারা। যুদ্ধ, অবরোধ ও পশু আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার কারণে উপত্যকাজুড়ে কোরবানির পশুর ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে।
একসময় গাজার অন্যতম বড় পশুপালক হিসেবে পরিচিত মাজেন আল-জেরজাউই এখন আর ভেড়া বা গরু বিক্রি করেন না। গাজা সিটির এই বাসিন্দা বর্তমানে একটি ছোট রেস্তোরাঁ চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন এবং বাইরে থেকে আসা হিমায়িত মাংসের ওপর নির্ভর করছেন।
মিডল ইস্ট আইকে তিনি বলেন, “বছরের এই সময় আমি প্রায় ২০০ ভেড়া ও গরু বিক্রি করতাম। এখন আমার কাছে একটিও নেই। গাজায় কোনো জীবন্ত পশু প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।”
তিনি অভিযোগ করেন, ইসরাইল এমনভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছে যেন গাজার মানুষ কেবল ন্যূনতমভাবে টিকে থাকতে পারে।
ঈদুল আজহা মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এ সময় সামর্থ্যবান মুসলমানরা পশু কোরবানি করে মাংস পরিবার, প্রতিবেশী ও অসহায়দের মধ্যে বিতরণ করেন। যুদ্ধের আগে গাজায় প্রতি বছর ঈদের আগে ৪০ হাজার থেকে ৬০ হাজার ভেড়া ও বাছুর আমদানি করা হতো।
কিন্তু ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। গাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি হামলা এবং কৃষি সরঞ্জাম ও পণ্য পরিবহনে নিষেধাজ্ঞার কারণে গাজার ৯০ শতাংশের বেশি পশুসম্পদ খাত ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয়ভাবে পশু উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে জীবন্ত পশু আমদানিও বন্ধ থাকায় বাজারে পশুর সংকট চরমে পৌঁছেছে।
যুদ্ধের আগে যেখানে একটি ভেড়ার দাম ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার, সেখানে বর্তমানে অবশিষ্ট অল্প কিছু পশুর দাম সাত হাজার ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে, গত নভেম্বর পর্যন্ত গাজার অন্তত ৮০ শতাংশ ভেড়া এবং ৭০ শতাংশ ছাগল মারা গেছে বা হত্যা করা হয়েছে।
একসময় তাজা মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে পরিচিত গাজার পশুপালন খাত এখন কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে প্রায় ২০ লাখ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা আরও বেড়েছে।
খামার, গোয়ালঘর, পশুখাদ্যের গুদাম এবং পশুচিকিৎসা কেন্দ্রগুলোও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। পশুখাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
জেরজাউই জানান, বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর তিনি বাধ্য হয়ে খুব কম দামে নিজের পশুগুলো বিক্রি করে দেন, যাতে আটা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনা যায়।
গাজার কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে উপত্যকায় প্রায় ৬০ হাজার ভেড়া ও ছাগল ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে মাত্র তিন হাজারে নেমে এসেছে। গরু ও বাছুর প্রায় পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাফাত আসালিয়া বলেন, এখনো যে অল্প কিছু ভেড়া ও ছাগল রয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই যাযাবর পশুপালকদের কাছে রয়েছে এবং ঈদের বাজারে সেগুলো পাওয়া যাবে না।
তিনি আরও বলেন, পানির কূপ সচল না থাকায় পশুপালন খাত পুনরুদ্ধারের বাস্তব কোনো সুযোগও নেই।
গাজা সিটির স্কুলশিক্ষক মুহাম্মদ আবুরিয়ালা বলেন, “মনে হচ্ছে আমরা তিন বছর ধরে ঈদই উদযাপন করিনি। অনেক মানুষ কোনোমতে খাবার জোগাড় করছে। কেউ কেউ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে মাংস খাননি।”
তিনি বলেন, গবাদি পশু প্রবেশের অনুমতি দিলে পশুপালক, পশুচিকিৎসক, কসাই, কৃষক ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের মতো বহু মানুষের জীবিকা টিকে থাকতে পারত।
তার অভিযোগ, “ইসরাইল সমাজকে পঙ্গু করে দিতে এবং আত্মনির্ভরশীল হতে বাধা দিতেই এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে।”
