ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও লড়ে যাচ্ছে অদম্য ইরান
ইরান যুদ্ধের এক মাস: কৌশলগতভাবে এগিয়ে তেহরান?
ইরানে মার্কিন ও ইসরাইলি আগ্রাসনের এক মাস পার হয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালায়। একই দিন ইসরাইল এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা শুরু করে তেহরান।
যুদ্ধের প্রথম দিনই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করা হলেও দেশটির শাসনব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং যারা ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার সমালোচক, তারাও শত্রুদের হাত থেকে দেশ রক্ষায় সরকারকে সহযোগিতা করছে। ফলে যুদ্ধের প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল।
বিবিসি, আলজাজিরা ও মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরান তার সামরিক সক্ষমতার প্রমাণ দিয়ে আসছে। ইসরাইলে হামলার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চালিয়েছে তেহরান। এতে ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর সক্ষমতাও কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধে প্রতিদিন প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের।
কৌশলগতভাবে এগিয়ে রয়েছে ইরান
মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখায় যুদ্ধে কৌশলগতভাবে ইরান এগিয়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬-এর সাবেক প্রধান স্যার অ্যালেক্স ইয়াঙ্গার এক পডকাস্টে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতির জটিলতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি। বাস্তবে ইরানের সরকার যতটা দৃঢ়তা দেখিয়েছে, তা অনেকের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি।
তিনি বলেন, ইরান তাদের সামরিক সক্ষমতা ছড়িয়ে দিয়েছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষমতা অর্পণ করেছে। ফলে ব্যাপক বিমান হামলার মধ্যেও তারা উল্লেখযোগ্যভাবে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করেছে।
২৫০ শিক্ষক-শিক্ষার্থী নিহত
ইরানে মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ২৫০ জন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান হোসেন সাদেগির বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে আলজাজিরা।
তিনি জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া হামলায় এখন পর্যন্ত দেশটির ৭২৩টি শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৬০০টিরও বেশি স্কুল সম্পূর্ণ ধ্বংস অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি
ইরানের রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় দেশজুড়ে ৯২ হাজারেরও বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মোট ৯২ হাজার ৬৬২টি ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার মধ্যে রয়েছে ৭১ হাজার ৩৫৬টি আবাসিক ইউনিট, ২০ হাজার ৩৯৯টি বাণিজ্যিক স্থাপনা, ২৯০টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং প্রায় ৬০০টি স্কুল।
এছাড়া এই যুদ্ধে রেড ক্রিসেন্টের ১৭টি কেন্দ্র, ৪৬টি অ্যাম্বুলেন্স এবং তিনটি ত্রাণবাহী হেলিকপ্টারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা
বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরান। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, এ প্রণালি দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করলে জাহাজগুলো কঠোর ব্যবস্থার মুখে পড়বে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট জানিয়েছে, এই ঘোষণার পর বিভিন্ন দেশের পতাকাবাহী অন্তত তিনটি কনটেইনারবাহী জাহাজ দিক পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে।
মার্কিন ঘাঁটিতে বড় ক্ষতি
বিবিসির এক বিশেষ বিশ্লেষণ এবং ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহেই মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে অন্তত ৮০০ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে।
তবে পেন্টাগন ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ধারণার চেয়েও বেশি হতে পারে।
