অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পূর্তি: ১২ সাফল্যের খতিয়ান
নিউজ ডেস্ক: ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে পূর্ববর্তী সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের আজ পূর্ণ হচ্ছে এক বছর। এই এক বছরে নতুন নেতৃত্ব কতটা অগ্রগতি আনতে পেরেছে—তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ। ঠিক এমন সময়েই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব তুলে ধরেছেন সরকারের ১২টি উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
বৃহস্পতিবার সকালে নিজের ভেরিফায়েড সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্টে এসব সাফল্যের তালিকা প্রকাশ করেন তিনি। চলুন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক সেই ১২টি অর্জন—
- শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা: অভ্যুত্থানের পর সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটিয়ে দেশে শান্তি ফিরে এসেছে। প্রেস সচিবের ভাষায়, “অধ্যাপক ইউনূসের নৈতিক নেতৃত্ব দেশকে পুনর্মিলন ও গণতন্ত্রের পথে ফিরিয়ে এনেছে।”
- অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন: খাদ্য মূল্যস্ফীতি অর্ধেকে নামানো হয়েছে, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ৩৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। প্রবাসী আয় রেকর্ড ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলার, রপ্তানিতে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং টাকার মান শক্তিশালী হয়েছে। ব্যাংক খাতেও ফিরেছে স্থিতিশীলতা।
- বিনিয়োগ ও বাণিজ্য: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সফল শুল্ক আলোচনা এবং হান্ডা গ্রুপের ২৫ কোটি ডলারের বিনিয়োগসহ দ্বিগুণ সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI)। চীনা বিনিয়োগকারীদেরও ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
- গণতান্ত্রিক সংস্কার ও জুলাই সনদ: ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে জাতীয় ঐক্য গঠিত হয়েছে। ঐতিহাসিক জুলাই সনদ স্বৈরতন্ত্র রুখতে কাঠামোগত জবাবদিহি নিশ্চিত করছে।
- জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার: মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়েছে, চলছে চারটি বড় মামলার কার্যক্রম। শেখ হাসিনার বিচার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
- নির্বাচন পরিকল্পনা ও সংস্কার: ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন নির্ধারিত। তরুণ, নারী ও প্রবাসী ভোটার অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ এবং ডিজিটাল মতামত প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে। নিরাপত্তায় ৮ লাখের বেশি সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা।
- প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি সংস্কার: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, পুলিশে মানবাধিকার সেল ও বডিক্যাম, দেওয়ানি-ফৌজদারি আইন সংস্কারসহ অনলাইন জিডির সুযোগ চালু করা হয়েছে।
- গণমাধ্যম ও ইন্টারনেট স্বাধীনতা: সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল, সাংবাদিকদের মামলা প্রত্যাহার এবং ইন্টারনেটকে মৌলিক অধিকার ঘোষণা করা হয়েছে।
- পররাষ্ট্রনীতি: বহুমাত্রিক কূটনীতি গড়ে তোলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য ও সহযোগিতা বাড়ানো হয়েছে। সার্ক ও আসিয়ানে সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
- প্রবাসী ও শ্রমিক অধিকার: আমিরাত ও মালয়েশিয়ায় নতুন ভিসা ব্যবস্থা, জাপানে ১ লাখ যুবকের পাঠানোর পরিকল্পনা এবং দক্ষিণ কোরিয়া ও সার্বিয়ায় শ্রমিক প্রেরণের উদ্যোগ।
- বিপ্লবীদের সহায়তা: ৭৭৫ শহীদ পরিবারকে ১০০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র ও ভাতা এবং ১৩,৮০০ আহতকে ১৫৩ কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। গুরুতরদের বিদেশে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
- সমুদ্র ও অবকাঠামো উন্নয়ন: বঙ্গোপসাগরকে জলভিত্তিক অর্থনীতির মূল সম্পদ ঘোষণা, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গভীর সমুদ্র প্রকল্পে বৈশ্বিক অংশীদারদের যুক্ত করা হয়েছে।
তবে এ সাফল্যের ভেতরেও রয়েছে কিছু প্রশ্ন। গণঅধিকার পরিষদের এক নেতার মন্তব্য, “হাসিনার দেশত্যাগই একমাত্র প্রাপ্তি হতে পারে না। নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণ করতে না পারলে এই গণঅভ্যুত্থান ব্যর্থ বলে গণ্য হবে।” তাঁর ভাষায়, “অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ১২টি প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু প্রাপ্তির পাল্লায় কী যোগ হলো—সেটাই এখন মূল্যায়নের সময়।”
প্রসঙ্গত, আগামী ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার এখন নতুন প্রস্তুতির পথে। এই এক বছরে যেসব সংস্কার হয়েছে, সেগুলো কতটা স্থায়ী হবে—তা নির্ভর করবে আগামী দিনের বাস্তবায়নের উপর।
আপনার মতামত কী? এই এক বছরে সরকার সত্যিই নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি গড়েছে, না কি এখনো অনেক পথ বাকি? আপনার মতামত জানান মন্তব্যে।
