মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম: যেখানে পেলে-ম্যারাডোনার হাতে উঠেছিল ট্রফি
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে কিছু স্টেডিয়াম শুধু একটি ভেন্যু নয়, বরং কিংবদন্তির অংশ। মেক্সিকোর রাজধানীতে অবস্থিত মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম, যা দীর্ঘদিন ধরে এস্তাদিও আজটেকা নামে পরিচিত, তেমনই একটি নাম। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের মাধ্যমে আবারও বিশ্ব ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দুতে আসছে এই ঐতিহাসিক স্টেডিয়াম।
আগামী ১১ জুন বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে এই ভেন্যুতে। এর মধ্য দিয়ে স্টেডিয়ামটি একটি অনন্য রেকর্ড গড়বে—বিশ্বের প্রথম এবং একমাত্র স্টেডিয়াম হিসেবে তিনটি ভিন্ন ফিফা বিশ্বকাপ (১৯৭০, ১৯৮৬ ও ২০২৬) আয়োজনের গৌরব অর্জন করবে।
বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম আইকনিক ভেন্যু
১৯৬৬ সালে নির্মিত মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম লাতিন আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ ফুটবল অ্যারেনা। প্রায় ৮৩ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই মাঠ শুধু আকারে নয়, ইতিহাসের কারণেও বিশ্ব ফুটবলে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে।
২০২৬ বিশ্বকাপে এখানে মোট পাঁচটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। তবে এই স্টেডিয়ামের আসল পরিচয় লুকিয়ে আছে এর অতীতের স্মরণীয় মুহূর্তগুলোতে, যা ফুটবল ইতিহাসকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে।
পেলে ও ম্যারাডোনার স্বপ্নপূরণের মঞ্চ
ফুটবল ইতিহাসে খুব কম ভেন্যুই এমন দাবি করতে পারে যে তারা দুই প্রজন্মের দুই সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়কে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তুলতে দেখেছে। মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম সেই বিরল সম্মানের অধিকারী।
১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিল এই মাঠে ইতালিকে হারিয়ে শিরোপা জেতে। সেই দলের নেতৃত্বে ছিলেন কিংবদন্তি পেলে। রিভেলিনো, টোস্তাও, জাইরজিনহো ও গারসনের মতো তারকাদের নিয়ে গড়া ব্রাজিলকে আজও অনেকেই সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ দল হিসেবে বিবেচনা করেন।
এর ১৬ বছর পর, ১৯৮৬ সালে একই মাঠে ইতিহাস রচনা করেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক দিয়েগো ম্যারাডোনা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তার করা ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তগুলোর মধ্যে স্থান পেয়েছে। পরে এই স্টেডিয়ামেই ম্যারাডোনা বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন।
‘ম্যাচ অব দ্য সেঞ্চুরি’র সাক্ষী
মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়ামের ইতিহাসে আরেকটি অবিস্মরণীয় অধ্যায় হলো ১৯৭০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল, যেখানে ইতালি ও পশ্চিম জার্মানি মুখোমুখি হয়েছিল। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এটি ‘ম্যাচ অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামে পরিচিত।
রোমাঞ্চে ভরা সেই ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে পাঁচ গোলসহ মোট সাতটি গোল হয়। শেষ পর্যন্ত ইতালি ৪-৩ ব্যবধানে জিতে ফাইনালে উঠলেও শিরোপা জিততে পারেনি।
মেক্সিকান ফুটবলেরও গর্ব
শুধু বিশ্বকাপ নয়, মেক্সিকোর নিজস্ব ফুটবল ইতিহাসেও এই স্টেডিয়ামের গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯৯৯ সালে কনফেডারেশন্স কাপ জয় এবং একই বছরে গোল্ড কাপ শিরোপা জয়ের স্মৃতি বহন করছে এই মাঠ। এছাড়া ২০১১ সালে মেক্সিকোর অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপজয়ী দলের উদযাপনও দেখেছে এই ভেন্যু।
বর্তমানে এটি মেক্সিকোর জনপ্রিয় ক্লাব ক্লাব আমেরিকার হোম গ্রাউন্ড। অতীতে ক্রুজ আজুল, নেকাসা, আতলান্তে এবং অ্যাতলেটিকো এস্পানলও এই স্টেডিয়ামকে নিজেদের ঘরের মাঠ হিসেবে ব্যবহার করেছে।
২০২৬ বিশ্বকাপে মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়ামের ম্যাচসূচি
- ১১ জুন: মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা
- ১৭ জুন: উজবেকিস্তান বনাম কলম্বিয়া
- ২৪ জুন: চেক প্রজাতন্ত্র বনাম মেক্সিকো
- ৩০ জুন: নকআউট পর্ব (শেষ ৩২)
- ৫ জুলাই: শেষ ষোলোর ম্যাচ
বিশ্বকাপের নতুন অধ্যায়ের অপেক্ষায়
২০২৬ বিশ্বকাপ হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর, যেখানে ৪৮টি দল অংশ নেবে এবং ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। সেই মহাযজ্ঞের সূচনা হবে এমন একটি স্টেডিয়াম থেকে, যার দেয়ালে লেখা রয়েছে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে গৌরবময় কিছু গল্প।
পেলে থেকে ম্যারাডোনা—দুই কিংবদন্তির স্মৃতি বহন করা এই মাঠ এবার নতুন ইতিহাসের সাক্ষী হতে প্রস্তুত। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী বাঁশি বাজতেই মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম আবারও ফুটবল বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে।
সূত্র: ফিফা ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনের আলোকে প্রস্তুত।
