বাবা হারানোর ৭ বছর পর মা-তিন বোন খুন, একা হয়ে গেলেন সিফাত
বাবাকে হারানোর শোক কাটিয়ে কষ্টের জীবনকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল ১৮ বছর বয়সী জুনায়েদ ইসলাম সিফাত। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এবার একদিনেই হারালেন নিজের মা ও তিন বোনকে। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে মুহূর্তেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন এই এইচএসসি শিক্ষার্থী।
সিফাত বর্তমানে রায়পুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্ব নিতে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। মাসে আট হাজার টাকা বেতনের সেই চাকরির আয় দিয়েই চলছিল মা ও ভাই-বোনদের সংসার।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সিফাতের বাবা মো. কামাল হোসেন জীবিকার তাগিদে হকারি করতেন। ২০১৯ সালে বৃষ্টির মধ্যে সিলভারের সামগ্রী বিক্রি করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। এরপর মা শাহিনুর বেগম তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে সংগ্রাম করে সংসার চালিয়ে আসছিলেন।
বৃহস্পতিবার সকালে রায়পুরের দেনায়েতপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শাহিনুর বেগম (৩৮), বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), মেজো মেয়ে ইকরা আক্তার (১৭) এবং ছোট মেয়ে শিফা আক্তারকে (৯) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পরে স্থানীয়দের গণপিটুনিতে অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার (২৮) নিহত হন।
বন্ধু ওমর ফারুক রনি বলেন, সিফাত ও তার ভাই-বোনরা সবাই মেধাবী ছিল। বাবা মারা যাওয়ার পরও তারা অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছিল। পরিবারের এমন পরিণতি কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
মা ও বোনদের হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সিফাত বলেন, "আমার মা, বোনদের কী অপরাধ ছিল? কেন তাদের এভাবে হত্যা করা হলো? এখন আমি কাদের নিয়ে বাঁচব? পৃথিবীতে আমার আর কেউ রইল না।"
রায়পুর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ জানান, সিফাত প্রায় সাত-আট মাস ধরে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছিলেন। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্বও পালন করছিলেন। এমন মর্মান্তিক ঘটনা মেনে নেওয়া কঠিন।
পুলিশ জানায়, কয়েক বছর ধরে শাহিনুর বেগম সন্তানদের নিয়ে ডাকাতিয়া নদীর পাড়ের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারও আগে একই এলাকায় ভাড়াটিয়া ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরেই তিনি ওই বাসায় প্রবেশ করেন।
লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক বলেন, ঘটনার সময় এক প্রতিবেশী অন্তরকে বাসায় দেখে সন্দেহ করেন। তিনি বাসার কলাপসিবল গেট আটকে স্থানীয়দের খবর দেন। দ্রুত ঘটনাটি জানাজানি হওয়ায় অভিযুক্ত পালাতে পারেননি।
হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশ ঘটনার তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং হত্যার পেছনের প্রকৃত কারণ উদঘাটনের চেষ্টা করছে।
