দীর্ঘ অপেক্ষার পর ঝুঁকিপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করল বাংলাদেশি জাহাজ
দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস পর হরমুজ প্রণালি পেরোল ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামরিক সংঘাত ও দীর্ঘ অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কার্গো জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। সরকারের উচ্চপর্যায়ের তদারকি, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় এবং জাহাজের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রচেষ্টায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ নিরাপদে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে জাহাজটি।
মঙ্গলবার বিএসসির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরের জলসীমার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সেখানে প্রয়োজনীয় বাংকারিং ও ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে। জাহাজে থাকা ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক ও ক্রু সদস্য সুস্থ ও নিরাপদ রয়েছেন।
বিএসসি জানায়, ২০১৮ সালে নির্মিত ৩৮ হাজার ৮৯৪ ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার বাল্ক ক্যারিয়ারটি চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি চার্টার চুক্তির আওতায় মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে। প্রথমে কাতারের মেসাইদ বন্দর থেকে প্রায় ৩৯ হাজার টন স্টিল কয়েল নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছে।
এদিকে অঞ্চলজুড়ে সামরিক উত্তেজনা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। গত ১১ মার্চ জেবেল আলী বন্দরে সফলভাবে কার্গো খালাস করা হলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক নৌযান চলাচল ব্যাহত হতে শুরু করে। ফলে জাহাজটির পরবর্তী যাত্রা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
এ অবস্থায় জাহাজটিকে অলস না রেখে বিকল্প বাণিজ্যিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে বিএসসি। পরিকল্পনা অনুযায়ী সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দরে পাঠিয়ে প্রায় ৩৭ হাজার মেট্রিক টন সার বোঝাই করা হয়, যা দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন ও ডারবান বন্দরে পরিবহনের জন্য নির্ধারিত ছিল।
বিএসসি দাবি করেছে, পুরো সংকটকালেও জাহাজটি একদিনের জন্যও ‘অফ-হায়ার’ হয়নি। অর্থাৎ চার্টার ভাড়া আদায় অব্যাহত ছিল এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমে কোনো স্থবিরতা সৃষ্টি হয়নি।
তবে সার বোঝাইয়ের পরও সংকট কাটেনি। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে জাহাজটি দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। একপর্যায়ে গত ১৮ এপ্রিল ইরান নৌবাহিনী নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে জাহাজটির ট্রানজিট অনুমতি প্রত্যাখ্যান করে। ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকতে হয় জাহাজটিকে।
দীর্ঘ প্রচেষ্টা, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির পর অবশেষে জাহাজটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। বিএসসি মনে করছে, এটি শুধু একটি বাণিজ্যিক সাফল্য নয়; বরং সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামুদ্রিক সক্ষমতা, নৌ-ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম সচল রাখার সক্ষমতারও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
