মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত করিডোরের কথা আলোচনা হয়েছে: মাহদী আমিন
বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনকে সংযুক্ত করে সম্ভাব্য একটি অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলার বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে অবকাঠামো, বাণিজ্য, নদী ব্যবস্থাপনা এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ একাধিক কৌশলগত বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।
শুক্রবার বেইজিংয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন জানান, মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি ইকোনমিক করিডোর প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ ও বিনিয়োগে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
আঞ্চলিক সংযোগে নতুন সম্ভাবনা
মাহদী আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য এই করিডোর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে পণ্য পরিবহন ব্যয় কমবে, নতুন বাজারে প্রবেশ সহজ হবে এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হবে।
যদিও প্রকল্পটির কাঠামো, অর্থায়ন কিংবা বাস্তবায়ন সময়সূচি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি, তবে আলোচনার বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের নতুন মাত্রা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তিস্তা প্রকল্প ও নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের আগ্রহ
সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন জানান, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং বাংলাদেশের অন্যান্য নদী ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে চীন সহযোগিতা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা তিস্তা প্রকল্প বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, পানি সংরক্ষণ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
নদীভাঙন, নাব্যতা সংকট এবং পানি ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চীনের প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মধ্যস্থতার বার্তা
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনায় চীন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে মধ্যস্থতায় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখো রোহিঙ্গার নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান কূটনৈতিক অগ্রাধিকার।
মাহদী আমিন বলেন, এই বিষয়ে আলোচনায় চীন সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে, যা সংকট সমাধানের প্রচেষ্টাকে নতুন গতি দিতে পারে।
বাণিজ্য ঘাটতি কমানো ও বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। মাহদী আমিন বলেন, চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার হলেও রপ্তানির তুলনায় আমদানি অনেক বেশি। ফলে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীনা বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং রপ্তানি সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে দ্রুত কাজ শুরু করতে চায় সরকার এবং এ ক্ষেত্রে চীনের উন্নয়ন সহযোগিতা প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
চীন সফরে একাধিক সমঝোতা স্মারক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা জোরদারে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে ১৬ দফা সমন্বিত যৌথ ইশতেহারও প্রণয়ন করা হয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই এই সফরের আয়োজন করা হয়েছে। তার মতে, সফরটি ভবিষ্যৎ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি নতুন ভিত্তি তৈরি করেছে।
ব্রিকস সদস্যপদে চীনের সমর্থনের ইঙ্গিত
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ব্রিকস জোটে সদস্যপদের জন্য আবেদন করলে চীন নীতিগতভাবে সমর্থন দিতে আগ্রহী। আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বাণিজ্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে এটি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন সফরে অবকাঠামো, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং কৌশলগত সহযোগিতার যেসব বিষয় উঠে এসেছে, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
Source: Based on reporting from Somoy News and statements by Prime Minister’s Adviser and PMO Spokesperson Mahdi Amin in Beijing.
