ক্ষোভে দুধ দিয়ে গোসল করে রাজনীতি ছাড়লেন বিএনপি সমর্থক
গাইবান্ধার সাঘাটায় স্বজন হত্যার বিচার না পাওয়ার অভিযোগ তুলে দুধ দিয়ে প্রতীকী গোসল করে রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন আব্দুল জলিল তোতা নামে এক ব্যক্তি। তিনি দাবি করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের সদস্যদের হত্যার বিচার না পাওয়ায় রাজনীতির প্রতি তার আস্থা নষ্ট হয়েছে। এ কারণে তিনি ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া এলাকায় নিজ বাড়িতে এই প্রতীকী কর্মসূচি পালন করেন তিনি। স্থানীয়ভাবে ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিচারহীনতার অভিযোগের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
‘বিচার না পাওয়ার হতাশা থেকে এই সিদ্ধান্ত’
আব্দুল জলিল তোতার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে তার চাচাত ভাই মুকুল প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ওই ঘটনার বিচার হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন। এর মধ্যেই সম্প্রতি তার আরেক স্বজন, ছাত্রশিবির নেতা সাইফুল্লাহ বারী হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
তিনি বলেন, বারবার স্বজন হারানো এবং বিচার না পাওয়ার অভিজ্ঞতা তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে। রাজনীতির প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন বলেই তিনি প্রকাশ্যে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তার দাবি, তিনি এখন একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করতে চান এবং কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে ন্যায়বিচার পাওয়াকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।
দুধ দিয়ে গোসলের প্রতীকী বার্তা
স্থানীয়দের উপস্থিতিতে দুধ দিয়ে গোসল করে আব্দুল জলিল জানান, এটি তার কাছে রাজনৈতিক জীবন থেকে বেরিয়ে আসার প্রতীক। তিনি মনে করেন, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহিংসতা ও প্রতিহিংসার পরিবর্তে ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দুধ দিয়ে গোসল বা অনুরূপ প্রতীকী কর্মসূচি অনেক সময় প্রতিবাদ, আত্মসমালোচনা বা নতুন করে পথচলার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আব্দুল জলিলের কর্মসূচিও সেই ধরনের একটি বার্তা বহন করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিয়ে ভিন্নমত
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, গত কয়েক বছর ধরে আব্দুল জলিল বিএনপির সমর্থক হিসেবে বিভিন্ন রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি নির্বাচনী দায়িত্বও পালন করেছিলেন বলে জানা গেছে।
তবে তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে স্থানীয় বিএনপি। সাঘাটা উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব সেলিম আহমেদ তুলিপ বলেছেন, আব্দুল জলিল তোতা দলের কোনো পদধারী নেতা বা কর্মী নন। তিনি বিএনপির কোনো কমিটির সদস্যও নন এবং বর্তমানে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
সেলিম আহমেদ তুলিপ আরও বলেন, আব্দুল জলিলের ব্যক্তিগত বক্তব্য, সিদ্ধান্ত বা কর্মসূচির দায় বিএনপি বহন করবে না।
সাইফুল্লাহ বারী হত্যাকাণ্ড নিয়ে উত্তেজনা
গত ২১ জুন সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া চারমাথা এলাকায় ছাত্রশিবির নেতা সাইফুল্লাহ বারীকে ছুরিকাঘাত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
সাইফুল্লাহ বারীর মৃত্যুর পর হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং দায়ীদের গ্রেফতারের দাবি বিভিন্ন মহল থেকে উঠেছে। আব্দুল জলিলও তার বক্তব্যে এই ঘটনার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিচারহীনতা ও রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে প্রশ্ন
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক সহিংসতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে দেশে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যেকোনো হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও অনাস্থা তৈরি হতে পারে।
গাইবান্ধার এই ঘটনাও সেই বাস্তবতার একটি প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা পূরণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
Source: Based on reporting from Naya Diganta and statements from local residents, Abdul Jalil Tota and Saghata Upazila BNP leaders.
