ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করা অসম্ভব
ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো কি সত্যিই ধ্বংস করা অসম্ভব?
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে আবারও আলোচনায় এসেছে ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো। সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ইরান গত কয়েক দশকে যে বিশাল ভূগর্ভস্থ “মিসাইল সিটি” বা ক্ষেপণাস্ত্র নগরী গড়ে তুলেছে, সেগুলো সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো উন্নত সামরিক শক্তির পক্ষেও এসব স্থাপনা স্থায়ীভাবে অকার্যকর করে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। 0
সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্র ও সামরিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিভিন্ন হামলার পরও ইরান তাদের অনেক ভূগর্ভস্থ স্থাপনার প্রবেশপথ দ্রুত পুনরায় চালু করতে সক্ষম হয়েছে। এতে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—এসব ঘাঁটি কি সত্যিই ধ্বংস করা সম্ভব, নাকি কেবল সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা যায়? 1
কী এই ‘মিসাইল সিটি’?
ইরান বহু বছর ধরে পাহাড় ও শক্ত শিলাস্তরের গভীরে বিশাল টানেল নেটওয়ার্ক নির্মাণ করেছে, যেগুলো সাধারণভাবে “মিসাইল সিটি” নামে পরিচিত। এসব স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র, মোবাইল লঞ্চার, গোলাবারুদ, কমান্ড সেন্টার এবং সামরিক সরঞ্জাম সংরক্ষণ করা হয়। 2
কিছু ঘাঁটি এত গভীরে নির্মিত যে সেগুলোকে প্রচলিত বিমান হামলা বা সাধারণ বোমা দিয়ে ধ্বংস করা কঠিন বলে মনে করা হয়। কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু স্থাপনা পাহাড়ের কয়েকশ মিটার গভীরে অবস্থান করছে। 3
কেন এগুলো ধ্বংস করা কঠিন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঘাঁটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের গভীরতা, বিস্তৃত টানেল নেটওয়ার্ক এবং একাধিক প্রবেশ ও নির্গমন পথ।
একটি প্রবেশপথ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য পথ ব্যবহার করে কার্যক্রম চালানো সম্ভব হতে পারে। এছাড়া অনেক স্থাপনায় স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও জরুরি অবকাঠামো থাকার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 4
তাহলে কি এগুলো সম্পূর্ণ নিরাপদ?
না। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, “ধ্বংস করা কঠিন” মানেই “অজেয়” নয়।
সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির প্রবেশপথ, সড়ক সংযোগ এবং লঞ্চিং অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে কিছু ঘাঁটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে। 5
তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, এসব হামলা ঘাঁটিগুলোকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস না করে মূলত তাদের কার্যক্ষমতা কিছু সময়ের জন্য কমিয়ে দিতে পারে। 6
স্যাটেলাইট চিত্রে কী দেখা গেছে?
সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হামলার পর ইরান দ্রুত ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বহু টানেলের মুখ পুনরায় পরিষ্কার ও চালু করার কাজ করেছে। কিছু ক্ষেত্রে অধিকাংশ প্রবেশপথ আবারও ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। 7
এতে বোঝা যায়, ইরানের সামরিক পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণভাবে বিবেচনা করা হয়েছে।
ইরানের কৌশল কী?
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান জানে যে খোলা আকাশে তাদের সামরিক অবকাঠামো সহজ লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তাই দেশটি বহু বছর ধরে ক্ষেপণাস্ত্র ও কৌশলগত সম্পদ পাহাড় ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় সরিয়ে নিয়েছে। 8
এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য হলো শত্রুপক্ষের প্রথম আঘাতের পরও পাল্টা হামলার সক্ষমতা ধরে রাখা।
ভবিষ্যতের যুদ্ধের জন্য কী বার্তা?
সামরিক গবেষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধে শুধু উন্নত অস্ত্র নয়, অবকাঠামোর টিকে থাকার ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো দেখাচ্ছে যে ভবিষ্যতের সংঘাতে পাহাড়, টানেল এবং গভীর সুরক্ষিত সামরিক স্থাপনা আরও বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। 9
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং ভূরাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের মতো আঞ্চলিক শক্তির সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা কৌশল আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য এবং নিরাপত্তা নীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
উপসংহার
ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোকে পুরোপুরি ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করছেন অনেক সামরিক বিশ্লেষক।
তবে এগুলোকে অস্থায়ীভাবে অকার্যকর করা, প্রবেশপথ বন্ধ করা বা কার্যক্রম ব্যাহত করা সম্ভব—এমন মতও রয়েছে। ফলে “অসম্ভব” শব্দটি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট: ইরানের ভূগর্ভস্থ সামরিক অবকাঠামো মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
