মাটির তলা থেকে ‘মিসাইল সিটি’ যেভাবে বাড়তি শক্তি দিচ্ছে ইরানকে
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডারই এখন যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার। ২০২২ সালে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের এক হিসাব অনুযায়ী, ইরানের কাছে ৩ হাজারেরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। গত এক দশকে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভেদের নির্ভুলতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র নেই এবং যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও নেই। তবে প্রচলিত অস্ত্র হিসেবে তাদের এই ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এই সক্ষমতার বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
বিমানবাহিনী দুর্বল, ভরসা ক্ষেপণাস্ত্র
ইরানের বিমানবাহিনী তুলনামূলকভাবে দুর্বল। তাদের কাছে আধুনিক যুদ্ধবিমান খুব কম। পুরোনো মিগ-২৯ ও টমক্যাট এফ-১৪ যুদ্ধবিমান দিয়েই মূলত বিমানবাহিনী পরিচালিত হয়। সম্প্রতি টানা হামলার কারণে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাও অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ফলে বর্তমানে ইরানের প্রধান সামরিক ভরসা হয়ে উঠেছে তাদের বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার।
মধ্যপ্রাচ্যে আঘাত হানতে সক্ষম
সামরিক বিশ্লেষক গিয়ের্মো পুলিদো বলেন, ইরানের প্রায় ২ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আঘাত হানতে সক্ষম। এর পাশাপাশি ইরানের কাছে বিপুল সংখ্যক কামিকাজে ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে।
পাহাড়ের নিচে ‘মিসাইল সিটি’
সম্ভাব্য যুদ্ধের কথা মাথায় রেখে ইরান দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করেছে ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’। বিশ্লেষকদের মতে, এগুলো পাহাড়ের গভীরে খোদাই করা ঘাঁটি, যেগুলোর কোনো কোনোটি মাটির প্রায় ৫০০ মিটার নিচে অবস্থিত।
এসব ঘাঁটিতে শাহাব-৩, সেজিল ও খোররামশাহরের মতো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রাখা হয়, যেগুলো প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।
ঘাঁটি ধ্বংস করাই লক্ষ্য
তবে পুলিদোর মতে, যদি এসব ঘাঁটির প্রবেশপথ ও উৎক্ষেপণ পথ ধ্বংস করা যায়, তাহলে সেগুলো কার্যত ‘কবরে’ পরিণত হবে। তখন ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা সম্ভব হবে না এবং লঞ্চার বহনকারী ট্রাকও বাইরে বের হতে পারবে না।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে এমন হামলার দাবি করেছে। তাদের দাবি, তাবরিজ এলাকায় একটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে।
নতুন ধরনের ‘সালভো যুদ্ধ’
গিয়ের্মো পুলিদোর মতে, এই সংঘাত নতুন ধরনের যুদ্ধের একটি উদাহরণ, যাকে তিনি ‘সালভো যুদ্ধ’ বলে উল্লেখ করেছেন। এখানে ভূমি দখল নয়, বরং প্রতিপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার ধ্বংস করাই প্রধান লক্ষ্য।
এই ধরনের যুদ্ধে ট্যাংক, যুদ্ধজাহাজ বা যুদ্ধবিমানের চেয়ে ক্ষেপণাস্ত্রই প্রধান ভূমিকা পালন করে।
বড় ঘাঁটি ও উৎপাদন কেন্দ্র
ইরানের সবচেয়ে বড় ‘মিসাইল সিটি’ লোরেস্তান প্রদেশের খোররামাবাদে অবস্থিত। এছাড়া পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের তাবরিজ ঘাঁটি দ্বিতীয় বৃহত্তম বলে জানা যায়। এখানকার কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ইউরোপের পূর্বাঞ্চলেও আঘাত হানতে সক্ষম।
অন্যদিকে ইসফাহানে রয়েছে ইরানের সবচেয়ে বড় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র।
গোয়েন্দা তথ্যই হতে পারে চাবিকাঠি
সামরিক বিশ্লেষক হেসুস পেরেজ ত্রিয়ানা বলেন, এই যুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে গোয়েন্দা তথ্য। সঠিক তথ্যের মাধ্যমে যদি ‘মিসাইল সিটি’গুলো খুঁজে বের করে ধ্বংস করা যায়, তাহলে সংঘাতের ফলাফল নির্ধারণ করা সহজ হবে।
