ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ধ্বংস করে ইরানের জয়

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও ইরানের নতুন সামরিক কৌশল

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ইরানের ‘স্যাটুরেশন স্ট্র্যাটেজি’: প্রতিরক্ষা ভাঙার নতুন কৌশল

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাত নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। ইরান তার প্রতিরক্ষা ভাঙার কৌশল ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সামনে যুদ্ধের নতুন প্যাটার্ন তুলে ধরছে। এই কৌশল ভবিষ্যতের কৌশলগত পরিবর্তনের সম্ভাবনাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানাচ্ছে, মার্কিন নেতৃত্বে হামলা শুরু হওয়ার পর ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে ব্যাপক ড্রোন, ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এতে সামরিক ঘাঁটি, বিমানবন্দর, তেল-গ্যাস অবকাঠামো এবং বেসামরিক স্থাপনায় হামলা বেড়েছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব পড়েছে।

বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)-এ ইরানের হামলা আর্থিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেও ড্রোন আঘাত হানার ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বন্দর ও শিপিং রুটে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছে এপি নিউজ

এই ধরনের হামলার মাধ্যমে ইরান কার্যত স্ট্রেট অব হরমুজ—বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথগুলোর একটিকে—ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এর ফলে বৈশ্বিক তেলবাজারে অস্থিরতা ও দামের উত্থান-পতন দেখা দিয়েছে।

এদিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (ইউএনএসসি) আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করলেও ইরান তা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে ধারাবাহিক হামলার পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছে।

দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ইরান শুধু সামরিক লক্ষ্য নয়, বরং নৌযান, বাণিজ্যিক পরিবহন এবং অবকাঠামোর ওপরও আক্রমণ চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই কৌশল ‘স্যাটুরেশন স্ট্র্যাটেজি’—যেখানে বহু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র একসাথে ব্যবহার করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করা হয় এবং রাডার ও ইন্টারসেপ্টর সিস্টেমগুলোকে চাপের মুখে ফেলা হয়।

দক্ষিণ উপসাগরীয় প্রতিরক্ষা সূত্র অনুযায়ী, এই সংঘাতে ইতোমধ্যে ১৪৪০টিরও বেশি ড্রোন এবং ২৫০টিরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত হয়েছে। অনেকগুলো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ধ্বংস হলেও কিছু হামলা বেসামরিক এলাকাতেও আঘাত হেনেছে।

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সতর্ক করেছে যে তেল-গ্যাস অবকাঠামোর ওপর হামলা শুধু যুদ্ধের বিষয় নয়, বরং পানি ও জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

অন্যদিকে ইউরোনিউজ বলছে, ড্রোন হামলার ছোট ছোট ঢেউও বিনিয়োগ, বিমান চলাচল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এই সংঘাতকে আন্তর্জাতিক আইনের জন্য বিপজ্জনক বলে মন্তব্য করেছেন এবং ইউরোপের নিরাপত্তা ও শক্তি বাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখন মডুলার স্ট্রাইকবিকেন্দ্রীকৃত কমান্ড স্ট্রাকচার ব্যবহার করছে, যা আধুনিক যুদ্ধের নতুন ধারা নির্দেশ করে।

আটলান্টিক কাউন্সিল, আইএসডব্লিউ এবং ক্রিটিক্যাল থ্রেটস প্রজেক্ট–এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনী ইরানের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক সক্ষমতা কমানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু ইরান এখনও নতুন কৌশল অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত শুধু সামরিক নয়; এটি নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আইন এবং ভূ-রাজনীতির বহুমাত্রিক প্রভাব সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে তেলবাজারে অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

Next Post Previous Post

Advertisement