শহীদদের আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে চিরদিন লিপিবদ্ধ থাকবে : প্রধান উপদেষ্টা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ঢাকার রায়েরবাজারে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা নিহতদের পরিচয় শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে। বাংলাদেশ পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি) ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে আটজন শহীদের পরিচয় নিশ্চিত করেছে। এই কার্যক্রমের প্রতিবেদন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

প্রতিবেদন গ্রহণ শেষে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, শহীদদের আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে চিরদিন লিপিবদ্ধ থাকবে এবং সত্যকে কখনো স্থায়ীভাবে আড়াল করা যায় না। তিনি এই উদ্যোগকে ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রের নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেন।

ডিএনএ কার্যক্রমের পটভূমি

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এবং স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় রায়েরবাজারে গণকবর থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ পরিচালিত হয়। সিআইডি জানায়, গত ৭ ডিসেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলমান ছিল। ওই সময়ে মোট ১১৪ জনের মৃতদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়, যাদের অধিকাংশই জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের সময় নিহত হন।

ইতোমধ্যে নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে নয়টি পরিবার ডিএনএ নমুনা প্রদান করেছে। পরীক্ষার মাধ্যমে আটজন শহীদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে এবং প্রত্যেকেই গুলিবিদ্ধ অবস্থায় নিহত হন বলে নিশ্চিত করেছে সিআইডি।

শনাক্ত হওয়া শহীদদের পরিচয়

সিআইডির তথ্যমতে, শনাক্ত হওয়া শহীদরা হলেন—সোহেল রানা (৩৮), রফিকুল ইসলাম (৫২), আসাদুল্লাহ (৩২), মাহিন মিয়া (৩২), ফয়সাল সরকার (২৬), পারভেজ বেপারী (২৩), কাবিল হোসেন (৫৮) এবং রফিকুল ইসলাম (২৯)। এই পরিচয় শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া নিখোঁজ পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছে।

আন্তর্জাতিক মান ও স্বচ্ছতা

কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে সিআইডির উদ্যোগে ফরেনসিক বিজ্ঞানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ ড. মরিস টিডবাল বিনজ পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। ঘটনাস্থলেই অস্থায়ী ল্যাব স্থাপন করে নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়, যা বাংলাদেশের ফরেনসিক সক্ষমতার একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. সিবগাত উল্লাহ জানান, এই কার্যক্রম পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট তদন্তে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, তৎকালীন সরকারের সময়ে সংঘটিত এই বর্বরতা সভ্য রাষ্ট্রের ইতিহাসে বিরল। নিজ দেশের নাগরিকদের হত্যা করে গণকবর দেওয়ার ঘটনা নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। তিনি বলেন, শহীদদের পরিচয় ফিরিয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগ নিখোঁজ পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়ের পথে একটি বড় অগ্রগতি।

তিনি আরও বলেন, এই ডিএনএ শনাক্তকরণ কেবল একটি ফরেনসিক কার্যক্রম নয়; এটি রাষ্ট্রের মানবিক মুখ পুনরুদ্ধার এবং সত্য উদঘাটনের পথে একটি সাহসী পদক্ষেপ। যারা এখনো প্রিয়জনের খোঁজে অপেক্ষা করছেন, তাদের জন্য এটি আশার আলো।

পরবর্তী করণীয়

সিআইডি জানিয়েছে, জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের সময় নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সিআইডির হটলাইন নম্বর ০১৩২০০১৯৯৯৯-এ যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এতে পরিচয় শনাক্তকরণ কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Source: Based on reporting from আমার দেশ

Next News Previous News