শেখ হাসিনা ও কামালের ফাঁসির ৪৫৭ পৃষ্ঠার রায় প্রকাশ
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে দেওয়া আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মঙ্গলবার ৪৫৭ পৃষ্ঠার এই রায় জনসমক্ষে প্রকাশ করে, যেখানে তৎকালীন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তর থেকে সহিংস দমন-পীড়নের নির্দেশনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রায়ে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে চলমান গণআন্দোলন দমনে পরিকল্পিতভাবে হত্যা, উসকানি এবং নৃশংস আচরণ সংঘটিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। আদালত এই মামলায় আনীত পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে দুটি নির্দিষ্ট অপরাধকে প্রমাণিত বলে রায় দেন।
দণ্ডাদেশ ও বিচারিক প্রক্রিয়া
এর আগে ১৭ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড এবং আসাদুজ্জামান খান কামালকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে তাদের দেশের ভেতরে থাকা সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। মামলায় রাজসাক্ষী হওয়ায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
প্রথম অভিযোগ: উসকানি ও হত্যার ধারাবাহিকতা
রায়ের প্রথম অভিযোগের অধীনে তিনটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার দেওয়া বক্তব্যে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ আখ্যা দেওয়া হয়, যা সহিংসতার উসকানি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। একই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য মাকসুদ কামালের সঙ্গে ফোনালাপে আন্দোলনকারীদের ‘ফাঁসি দেওয়ার’ নির্দেশনামূলক মন্তব্যের প্রমাণও আদালতে উপস্থাপিত হয়।
এই উসকানি ও নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় রংপুরে আন্দোলনকারী আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। আদালত বলেন, শীর্ষ পর্যায় থেকে এ ধরনের বক্তব্য ও নির্দেশ অধস্তন বাহিনীকে অপরাধ সংঘটনে উৎসাহিত করেছে। এই অভিযোগে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় অভিযোগ: পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ও নৃশংসতা
দ্বিতীয় অভিযোগে আরও তিনটি ঘটনার বিবরণ উঠে আসে। রায়ে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র ফজলে নূর তাপস ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে শেখ হাসিনার একাধিক ফোনালাপের তথ্য তদন্তে পাওয়া যায়। এসব কথোপকথনে ড্রোনের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের অবস্থান শনাক্ত এবং হেলিকপ্টার ও মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশনার কথা বলা হয়েছে।
এই নির্দেশনার ফল হিসেবে ৫ আগস্ট ঢাকার চানখারপুল এলাকায় ছয়জন আন্দোলনকারী পুলিশের গুলিতে নিহত হন। একই দিনে সাভারের আশুলিয়ায় আরও ছয়জনকে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে ফেলার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটে। এসব অপরাধের ভয়াবহতা ও পরিকল্পিত চরিত্র বিবেচনায় আদালত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।
বাংলাদেশের জন্য আইনি ও সামাজিক তাৎপর্য
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় একটি নজিরবিহীন অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সম্পন্ন হওয়ায় ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আইনি জবাবদিহিতা আরও জোরদার হবে বলে তারা মনে করেন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য এটি ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রায়ের মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ ও রাষ্ট্রীয় দমননীতির একটি প্রামাণ্য দলিল তৈরি হলো, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস হয়ে থাকবে।
Source: Based on reporting from Dhaka Post
