কদমতলী গোলচত্বর: কোটি টাকার চাঁদাবাজির 'স্বর্গরাজ্য'
ঢাকার কদমতলী গোলচত্বর ও দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতুর আশপাশের এলাকা পরিণত হয়েছে এক ভয়াবহ চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের দখলে। মাত্র এক কিলোমিটারে প্রতিমাসে আদায় হচ্ছে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা।
ফুটপাতের হকার থেকে শুরু করে সিএনজি, অটোরিকশা, ভ্যান, হাসপাতাল, রেস্তোরাঁ—সবখান থেকেই নিয়মিতভাবে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এমনকি রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীরাও একসঙ্গে চাঁদাবাজির এই চক্রে জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভয়াবহ চাঁদাবাজির চিত্র
অনুসন্ধান অনুযায়ী, শুধু কদমতলী ব্রিজের ঢালের ৩২টি ফলের দোকান থেকেই মাসে তোলা হয় প্রায় ১.৯২ লাখ টাকা। চোরাই মোবাইলের ৫৭টি দোকান থেকে ৫.১৩ লাখ টাকা, আর ফুচকা, চা-পান, ফাস্টফুডের ৭৫টি দোকান থেকে আদায় হয় ৩.৪২ লাখ টাকা।
তানাকা পেট্রোল পাম্প থেকে ইমামবাড়ী স্কুল পর্যন্ত ২০৯টি ভাসমান দোকান থেকে মাসে আদায় হয় ১২.৫৪ লাখ টাকা। ঢাকার লাইনের সিএনজি, বাইক, পাঠাও, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস থেকেও প্রতি মাসে আসে ১.১০ লাখ টাকার চাঁদা।
পরিবহন খাতেই সবচেয়ে বেশি চাঁদা
বিআরটিসির ৭০টি গাড়ি থেকে মাসে ওঠে ৫.২৫ লাখ টাকা, আর তিনটি বেসরকারি কোম্পানির ২০০টি গাড়ি থেকে আদায় হয় ১৮ লাখ টাকা। ১৪০টি সিএনজি থেকে আদায় হচ্ছে ৭.৭০ লাখ টাকা।
২১৮টি ভ্যানের প্রতিটি থেকে মাসে গড়ে আদায় হয় ২৭০০ টাকা করে প্রায় ২৩.৫৪ লাখ টাকা। আর ৩০০টির বেশি অটোরিকশা থেকে প্রতি মাসে চাঁদা তোলা হয় প্রায় ২৫.২০ লাখ টাকা।
রাজনীতির ছায়ায় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট
দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতুর নয়াবাজার প্রান্ত নিয়ন্ত্রণ করছে বিএনপি নেতা, আর কদমতলী সাইট নিয়ন্ত্রণ করছেন যুবদলের স্থানীয় নেতা। এই দুই নেতার অধীনে কাজ করছে ১৫-২০ জনের একটি সংঘবদ্ধ চাঁদা তোলার টিম। তাদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা, এমনকি যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের সদস্যরাও।
পুলিশের নামেও উঠছে অভিযোগ
ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি প্রতিটি সিএনজি থেকে মাসে ৭০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করেন, আর এ কাজ করেন পুলিশেরই এক সোর্স শহীদ। তাঁর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে অর্থের বিনিময়ে সেতুতে উল্টো পথে যানবাহন চলাচলের অনুমতি দেওয়ার।
তবে এ বিষয়ে ট্রাফিক ইনচার্জ মুজিবর রহমান জানান, “কদমতলী গোলচত্বর খুলে দেওয়ায় এখন আর গাড়ি উল্টা পথে চলে না।” তিনি চাঁদা তোলার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমার নামে কেউ চাঁদা তুললে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া
বিএনপির স্থানীয় সভাপতি জানান, “যারা চাঁদা তোলেন, তারা আমার লোক নয়।” তাঁর ভাষায়, ‘বুড়িগঙ্গা সেতুতে কেরানীগঞ্জ, বংশাল ও কোতোয়ালি থানার কিছু লোক চাঁদা আদায় করছে।’
তাজা আপডেট
ট্রাফিক পুলিশের দাবি, সম্প্রতি অভিযানে ৪৪ জনকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ, চাঁদাবাজির শেকড় অনেক গভীরে, যেটি এখনো রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
প্রশ্ন রইল—রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এই চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের লাগাম টানবে কে? প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হবে?
