এক বছরের মাথায় ‘নতুন বাংলাদেশ’: নির্বাচনের ঘোষণা, ঐক্যের বার্তা ও ভবিষ্যতের রূপরেখা
নিউজ ডেস্ক: ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসানের এক বছর পূর্ণ হলো। এই সময়ের মধ্যে পাল্টে গেছে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট, নেতৃত্ব এসেছে নতুন রূপে, আর আগামী নির্বাচন ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন আশাবাদের আবহ।
একসময় দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সাবেক শাসক এখন পলাতক। তাঁর বিরুদ্ধে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি থাকায় দেশে ফেরা কিংবা অন্য কোনো দেশে আশ্রয় নেওয়ার পথ প্রায় বন্ধ। তাঁর ভাষায়, ‘গণতন্ত্রকে হত্যা করে ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটা হয়েছে।’ এখন সেই ইতিহাসই বিচার করছে সময়।
তবে প্রাক্তন শাসকের অনুগত একটি শ্রেণি এখনো দেশে সক্রিয়, যারা বিভিন্ন অঙ্গনে থেকে আগের রাজনৈতিক বলয়ের পক্ষে বয়ান তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ‘আপা ফিরবেন’—এই স্বপ্নে বিভোর কিছু অংশ অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে মরিয়া। তবে সরকার এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে এই ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে এগিয়ে যাচ্ছে গণতান্ত্রিক পথে।
‘জুলাই সনদ’: ঐক্যের নতুন ঘোষণা
৫ আগস্ট দেশের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় রচিত হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে ঘোষিত হয় ‘জুলাই সনদ’। এই ঘোষণাপত্রে উঠে এসেছে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস, শহীদদের স্বীকৃতি ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রগঠনের রূপরেখা।
ঘোষণাপত্রের ৬ নম্বর দফায় বলা হয়েছে, “দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে গণতান্ত্রিক ধারা ব্যাহত হয়ে একচ্ছত্র ক্ষমতার পথ সুগম হয়।” আর ১৩ নম্বর দফায় বলা হয়, “তিনটি প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছিল।”
এই সনদে জুলাই আন্দোলনের শহীদদের ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং আগামী সংবিধানে এর সংযুক্তির অভিপ্রায় প্রকাশ করা হয়েছে। এক কথায়, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি হলো এই ঘোষণার মাধ্যমে।
ঐতিহাসিক ঐক্য এবং বিভাজনের পুনরুত্থান
ডান, বাম এবং ইসলামী ঘরানার রাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘদিন পর এক মঞ্চে এসেছে। অথচ এই ঐক্যের মুহূর্তেও বিভাজনের রাজনীতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা স্পষ্ট। একাধিক বামঘরানার সংগঠন আবারও ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র ব্যানারে বিভাজন সৃষ্টি করতে চাইছে। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বিচারিক হত্যাকাণ্ডের শিকার নেতাদের ছবি সরানো নিয়ে সংঘাত—তা-ই প্রমাণ করে।
এই প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দেখছেন দিল্লির ‘সফট পাওয়ার’ প্রয়োগ হিসেবে, যার উদ্দেশ্য—একবার বিদায় নেওয়া শক্তিকে পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করা।
নির্বাচনের ঘোষণা: অনিশ্চয়তা কাটল
গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধান উপদেষ্টা। তাঁর কথায়, “রমজানের আগে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।” তিনি আরও জানান, প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তিনি বলেছেন, “এবারের নির্বাচনে আমরা আমাদের বকেয়া আনন্দসহ মহা আনন্দে ভোট দিতে চাই… এ দিনটি যেন ঈদের উৎসবে রূপ নেয়।”
এক বছরে কী পেলাম?
অনেকেই প্রশ্ন করছেন—হাসিনার পতনের পর এক বছরে দেশের প্রাপ্তি কী? বিশ্লেষকরা বলছেন, সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—ভয়মুক্ত সমাজ, কথা বলার স্বাধীনতা, নিপীড়নহীন ক্যাম্পাস, গুম-খুনের অবসান এবং শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পথচলার প্রস্তুতি।
অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে থাকা সময় ও সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রাষ্ট্র সংস্কারের সব প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এখন দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর—এই ঐক্য ও চেতনা কীভাবে তারা ধারণ করে, সেটাই আগামী দিনের পথ নির্ধারণ করবে।
শেষ কথা: এক দশকের বেশি সময় পর দেশে একটি উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং উৎসবমুখর নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—এই ঐক্য ও অর্জন ধরে রেখে বাংলাদেশ কি সত্যিই নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারবে?
