মাদারীপুরের তিন আসনে জমজমাট নির্বাচনি প্রস্তুতি: বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী দলগুলোর তৎপরতা চূড়ান্ত পর্যায়ে
নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র আধিপত্যে থাকা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জেলা মাদারীপুরে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ। তিন যুগের বেশি সময় পর এলাকাবাসী ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের ভাবনায় এসেছে পরিবর্তনের হিসাব-নিকাশ।
ফ্যাসিবাদ বিদায় নেওয়ায় অনেকটাই উন্মুক্ত হয়েছে নির্বাচনি মাঠ। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিসসহ ইসলামি ঘরানার দলগুলো বেশ চাঙাভাবেই শুরু করেছে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম। পুরো জেলাজুড়েই চলছে মিছিল, সভা, গণসংযোগ আর পোস্টার-লিফলেট বিতরণ।
তিনটি আসনের ভোটযুদ্ধ: কারা থাকছেন লড়াইয়ে?
মাদারীপুর জেলাটি আড়িয়ালখাঁ, কুমার ও নিম্ন কুমারসহ সাতটি নদী দ্বারা বেষ্টিত। মোট ভোটার ৪ লাখ ৩ হাজার ৭৪২ জন। জেলার পাঁচটি উপজেলা ও চারটি পৌরসভা মিলিয়ে রয়েছে তিনটি আসন। প্রতিটি আসনে দেখা যাচ্ছে বিএনপির একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী। তবে দলীয় সিদ্ধান্তে যিনি চূড়ান্ত মনোনয়ন পাবেন, বাকিরা তার পক্ষেই কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন নেতারা। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন ইতোমধ্যেই তাদের প্রার্থীদের নাম চূড়ান্ত করে দিয়েছে।
মাদারীপুর-১ (শিবচর): একাধিক প্রার্থী, বিভক্ত বিএনপি
এই আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেতে এগিয়ে রয়েছেন কামাল জামান নূরুদ্দিন মোল্লা, নাদিরা মিঠু চৌধুরী, সাজ্জাদ হোসেন লাভলু সিদ্দিকী ও ইয়াজ্জেম হোসেন রোমান। জামায়াত প্রার্থী মাওলানা সরোয়ার হোসেন বলেন, “আমরা নির্বাচনি কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছি। কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি করা হয়ে গেছে।” ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা আকরাম হোসেনও রয়েছেন সক্রিয় ভূমিকায়।
বিএনপির সাবেক এমপি নাবিলা মিঠু চৌধুরীর ভাষায়, “আমি সম্পূর্ণভাবে আশাবাদী আমি নমিনেশন পাব।” অপরপ্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন লাভলু বলেন, “আমি ২০১৮ সালে নির্বাচন করেছি, তাই মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।”
মাদারীপুর-২ (রাজৈর ও সদরের একাংশ): শাজাহান খানের শূন্যতা, বিএনপিতে দৌড়ঝাঁপ
প্রায় তিন দশক শাজাহান খানের দখলে থাকা এই আসনে এখন প্রার্থী হতে চান হেলেন জেরিন খান, জাহান্দার আলী জাহান, মিল্টন বৈদ্য, মাসুদ পারভেজ ও জাফর আলী মিয়া। জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা আব্দুস সোবাহান খাঁন বলেন, “প্রতিটি কেন্দ্রে আমাদের কমিটি গঠন করা হয়েছে। মিটিং ও গণসংযোগ চলছে পুরোদমে।”
মনোনয়নপ্রত্যাশী মাসুদ পারভেজ বলেন, “আমি দলের নাম ভাঙিয়ে কোথাও চাঁদাবাজি করিনি।” অপরদিকে, জাহান্দার আলী জাহান বলেন, “৪৪ বছরের রাজনৈতিক জীবন, বহু নির্যাতন সহ্য করেছি—আমি মনোনয়নের যোগ্য দাবিদার।”
মাদারীপুর-৩ (কালকিনি, ডাসার ও সদরের একাংশ): বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজন, সুযোগ নিচ্ছে ইসলামি দলগুলো
এই আসনে মনোনয়ন চাইছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মাশুকুর রহমান ও আনিসুর রহমান খোকন। মাশুক বলেন, “আমি ৪৫ বছর ধরে বিএনপির রাজনীতি করি। এই আসনে বিএনপির রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করেছি। আমি মনোনয়নের হকদার।”
জামায়াতের প্রার্থী রফিকুল ইসলাম মৃধা এবং ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা এসএম আজিজুল হক এলাকার প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
উন্নয়ন ও অবকাঠামো নিয়ে ক্ষোভ
মাদারীপুরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের বাড়ি থাকলেও এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নে তেমন অগ্রগতি হয়নি। ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চার লেনের সড়ক মাত্র পাঁচ বছরেই ক্ষতবিক্ষত। জেলা সদর হাসপাতালেও পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু হয়নি। মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি উপেক্ষিতই রয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট ও প্রশ্ন
৫ আগস্টের পর থেকে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী মাঠে অনুপস্থিত, কেউ কেউ আবার পা বাড়াচ্ছেন বিএনপি বা জামায়াত ঘরানার দিকে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এই প্রবণতা প্রশ্ন তুলছে—পুরনো ক্ষমতাকাঠামোর ভরসা কি ভেঙে পড়ছে? নাকি এটি শুধুই কৌশল?
আপনার ভাবনা?
নতুন এই সমীকরণে মাদারীপুরের মানুষ কাকে বেছে নেবে? তিন যুগের অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে কি তারা এবার খুঁজবে নতুন নেতৃত্ব? নির্বাচন ঘিরে জনগণের প্রত্যাশা ও দলের প্রতিশ্রুতি—মেলাতে পারবে তো মিল?
