নিষেধাজ্ঞার মাঝেই ইরানের অগ্রযাত্রা: আত্মনির্ভরতা ও কৌশলে বিশ্বে ব্যতিক্রমী উদাহরণ
বিশ্ব রাজনীতির আলোচিত মঞ্চে ইরান এখন এক ব্যতিক্রমী নাম—যে দেশটি পশ্চিমা বিশ্বের ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও নিজের অস্তিত্ব ও শক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে দৃঢ় কৌশল, প্রযুক্তি এবং আত্মনির্ভরতায়।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক রূপ নেয় অবিশ্বাস ও শত্রুতায়। পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ২০০৬ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র একযোগে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তেহরানের ওপর। যদিও ২০১৫ সালে পরমাণু চুক্তির মাধ্যমে কিছুটা স্বস্তি আসে, ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বতন প্রশাসন একতরফাভাবে চুক্তি থেকে সরে গিয়ে আবারো নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
তবে এসব নিষেধাজ্ঞা ইরানকে দমাতে পারেনি, বরং আত্মনির্ভরতার পথেই এগিয়ে দিয়েছে। নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি করছে ড্রোন, হাইপারসোনিক মিসাইল, যুদ্ধবিমান, রাডার ও নৌযান। তৈরি হয়েছে ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ ও সামরিক গবেষণাগার, যেগুলোকে বাংকার বাস্টার বোমাও ভেদ করতে পারেনি বলে দাবি তেহরানের।
দেশটির এলিট ফোর্স 'ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড' এখন শুধু একটি সামরিক বাহিনী নয়—বরং আঞ্চলিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন ও গাজায় তাদের মিত্র মিলিশিয়ারা পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলছে।
অর্থনীতিতেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে সরে গিয়ে চীন, ভারত ও ভেনেজুয়েলার মতো দেশের সঙ্গে বিকল্প বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে ইরান। দেশের অভ্যন্তরে শিল্প, কৃষি ও প্রযুক্তি খাতে গড়ে উঠেছে স্বনির্ভর কাঠামো।
ক্রিপ্টোকারেন্সি ও বার্টার ট্রেডের মাধ্যমে ডলার নির্ভরতা কমিয়ে আনছে দেশটি। “তাঁর ভাষায়, ‘নিষেধাজ্ঞা আমাদের থামাতে পারেনি, বরং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পথ দেখিয়েছে।’”
পরমাণু গবেষণা, বায়োটেকনোলজি, ন্যানো ও মহাকাশ প্রযুক্তিতেও ইরান দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। ২০০৯ সালে নিজস্ব উপগ্রহ উৎক্ষেপণ এবং পরবর্তীতে মানুষবিহীন মহাকাশযান পাঠিয়ে প্রযুক্তির দৌড়ে বিশ্বে নিজের অবস্থান জানান দিয়েছে।
একদিকে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে দূরত্ব, অন্যদিকে চীন, রাশিয়া, তুরস্ক ও কাতারের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক—এই বহুমুখী কূটনীতির দৃষ্টান্তও গড়ে তুলছে তেহরান। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (SCO) ও ব্রিক্সে অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে তাদের সক্রিয়তা এই অবস্থান আরও স্পষ্ট করে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিষেধাজ্ঞা ইরানকে দুর্বল করেনি, বরং শক্তিশালী করেছে। প্রতিটি চাপই যেন তাদের আরও আত্মবিশ্বাসী ও কৌশলগতভাবে দক্ষ করে তুলছে।
প্রশ্ন উঠছে—বিশ্ব রাজনীতির এই চ্যালেঞ্জিং পরিবেশে আত্মনির্ভরতার ইরানি মডেল কি ভবিষ্যতের উদাহরণ হয়ে উঠবে অন্য দেশের জন্যও?
