শিক্ষাঙ্গনে দলীয় লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি বন্ধের দাবি আবারও জোরাল

বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে একটি দাবি—দলীয় লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় এই দাবি সর্বজনীনভাবে উঠে এসেছিল। তবে আজও কার্যকর হয়নি সেই প্রত্যাশা। বরং সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে দলীয় লেজুড়বৃত্তি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন্ন ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল সম্প্রতি ১৮টি হলে নতুন কমিটি ঘোষণা করেছে। এর বিরোধিতায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গত বছর ঘোষণা দেয়—শিক্ষাঙ্গনে আর দলীয় রাজনীতি নয়। এই সিদ্ধান্ত তখন শিক্ষার্থী-জনগণের প্রশংসা কুড়ালেও দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তা বাস্তবায়ন হয়নি।

তবে একটি মহল এখনও বিতর্ক তুলছে ছাত্ররাজনীতি বনাম দলীয় লেজুড়বৃত্তি নিয়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ছাত্ররাজনীতি অবশ্যই থাকবে—কিন্তু তা হতে হবে ছাত্র সংসদনির্ভর। অর্থাৎ শিক্ষার উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের কল্যাণ ও জাতীয় স্বার্থে আন্দোলনই হবে সেই রাজনীতির মূল লক্ষ্য।

অতীতের অন্ধকার ইতিহাস

শিক্ষাঙ্গনের সহিংসতা নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের সংঘর্ষে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রাণ গেছে ৮৫ শিক্ষার্থীর। ১৯৭৪ সালে মুহসীন হলে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে এক রাতে নিহত হন সাতজন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন ১৯ জন শিক্ষার্থী। অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগরে ছাত্রলীগের এক নেতা কুখ্যাত হয়েছিলেন “সেঞ্চুরিয়ান ধর্ষক” নামে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় ক্যাডাররা দখল করেছে আবাসন, নিয়ন্ত্রণ করেছে টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি। একশ্রেণির শিক্ষকও দলীয় বিভাজনের মাধ্যমে শিক্ষাঙ্গন অস্থির করেছেন। এতে শুধু শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়নি, সেশনজট আর অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।

গৌরবের ইতিহাস বনাম বর্তমান অবক্ষয়

বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ একসময় ছিল মুক্তির প্রেরণার উৎস—৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন তারা। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই ছাত্ররাজনীতিতে ঢুকে পড়ে সন্ত্রাস ও দলীয় আনুগত্য। ফলে শিক্ষাঙ্গন হারায় তার স্বাধীনচেতা ঐতিহ্য।

সমাধানের প্রস্তাব

২০০৮ সালের সহিংস ঘটনার পর গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন সুপারিশ করেছিল—শিক্ষাঙ্গনে সরাসরি দলীয় রাজনীতি বন্ধ করতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ও রাজনৈতিক দলের বিধান সংস্কার করতে হবে।

সাম্প্রতিককালে অন্তর্বর্তী সরকারও শিক্ষাঙ্গনে সরাসরি দলীয় রাজনীতির পথ রুদ্ধ করার পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বলে আভাস মিলেছে। শিক্ষাবিদদের মতে, ডাকসুসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত, নিরপেক্ষ ছাত্র সংসদ নির্বাচনই হতে পারে টেকসই সমাধান।

সর্বশেষ প্রেক্ষাপট

এখনো ক্যাম্পাসে মুষ্টিমেয় দলবাজ শিক্ষার্থীর দৌরাত্ম্যে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভোগান্তিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে গণরুম সংস্কৃতি, দখল, এবং অবৈধ সুবিধাভোগ চলছে বলে অভিযোগ। অন্যদিকে সিংহভাগ শিক্ষার্থী চান কেবল একটি শান্তিপূর্ণ পড়াশোনার পরিবেশ।

তাঁদের ভাষায়, “আমরা রাজনীতি চাই না, চাই সুষ্ঠু শিক্ষা, নিরাপদ ক্যাম্পাস আর মেধার স্বীকৃতি।”


প্রশ্ন থেকে যায়—শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় দলীয় লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি বন্ধে কি এবার সত্যিই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে?

Next News Previous News