সাবেক সেনাপ্রধানের প্রকাশ, র‌্যাব ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অন্ধকার অধ্যায়ে জড়িত ছিলেন জিয়াউল আহসান

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে আলোচিত ও বিতর্কিত নাম মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসান। সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার বর্ণনায় উঠে এসেছে, র‌্যাবে কর্মরত অবস্থায় তিনি কীভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমে জড়িয়ে পড়েছিলেন।

তাঁর ভাষায়, “যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি পীড়া দিত, তা ছিল র‍্যাব-এ থাকা অফিসারদের দ্বারা সাধারণ নাগরিক, রাজনৈতিক কর্মী বা সন্দেহভাজনদের অপহরণ ও হত্যা।” তিনি জানান, তরুণ কর্মকর্তারা র‌্যাবে গিয়ে ফিরে আসতেন ভিন্ন চরিত্র নিয়ে, যেন তারা পেশাদার খুনি। এমন প্রবণতা সেনা সদস্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল।

সাবেক সেনাপ্রধান আরও উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি জানালে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে র‌্যাবের কর্মকাণ্ড জাতীয় রক্ষীবাহিনীর চেয়েও খারাপ। এমনকি র‌্যাবে কর্মরত এক পর্যায়ে কর্নেল জিয়াউল আহসানকে ‘ক্রসফায়ার’ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেয়া হলেও, পরবর্তীতে বোঝা যায় ঘটনাগুলো ঘটছে তবে সংবাদ প্রকাশ বন্ধ রাখা হচ্ছে।

সেনাপ্রধানের মতে, জিয়াউল আহসানের আচরণ ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তিনি বাসায় অস্ত্র মজুত, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং ব্যক্তিগত গার্ড রাখতেন। একাধিক জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেও কোনো ফল হয়নি।

জিয়াউল আহসানের কর্মজীবন

সেনাবাহিনীর ২৪তম লং কোর্স থেকে কমিশনপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তা ২০০৯ সালে র‌্যাব-২ এ যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান, অতিরিক্ত মহাপরিচালক, এবং র‌্যাবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশে অভিযান এবং নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকার অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তীতে তিনি এনএসআই, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) সহ বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্বে ছিলেন। ২০২১ সালে তিনি মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন এবং এনটিএমসির মহাপরিচালক হন।

অভিযোগ ও বিতর্ক

গুম কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশে সংঘটিত বহু গুম ও হত্যার ঘটনায় তাঁর টিমের সম্পৃক্ততা ছিল। অভিযোগ রয়েছে, গুম হওয়া অনেক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে এবং এই সংখ্যাটি এক হাজারের বেশি। এর মধ্যে বুড়িগঙ্গার পোস্তগোলা ঘাটকেও এই অপরাধের নীরব সাক্ষী বলা হয়।

সাবেক সেনাপ্রধানের অভিমতে, জিয়াউল আহসান শুধু বাহিনীর অভ্যন্তরে নয়, রাজনৈতিক ক্ষমতার আশ্রয়ে থেকেও প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। এমনকি সেনানিবাসের ভেতরে তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করতে হয়েছিল।

সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বারবার উঠে এসেছে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রসঙ্গ। আন্তর্জাতিক মহল থেকেও এ বিষয়ে তীব্র উদ্বেগ জানানো হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে—বছরের পর বছর চলা এসব কর্মকাণ্ডের সত্য উদঘাটন কি সম্ভব হবে? আর ন্যায়বিচারের মুখ কি দেখবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো?

Next News Previous News