মহিপালে বিভীষিকাময় হামলার এক বছর — ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় স্বজনরা

ফেনীর মহিপালে গত বছরের এই দিনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অবস্থান কর্মসূচি রূপ নেয় এক রক্তাক্ত হত্যাযজ্ঞে। শত শত ছাত্রছাত্রী ও স্থানীয় মানুষ অংশ নেন ওই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে। কিন্তু দুপুরের পর হঠাৎ সশস্ত্র হামলায় মুহুর্মুহু গুলিতে কেঁপে ওঠে মহিপাল গোল চত্বর। গুলির শব্দ, বারুদের গন্ধ আর আতঙ্কে সেই এলাকা পরিণত হয়েছিল যুদ্ধক্ষেত্রে।

নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলিতে ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে প্রাণ হারান সাতজন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইসতিয়াক আহমেদ শ্রাবণ, সরওয়ার জাহান মাসুদ, মো. সবুজ, ছাইদুল ইসলাম শাহী, জাকির হোসেন শাকিব, ওয়াকিল আহম্মেদ শিহাব এবং পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান শিক্ষার্থী মাহবুবুল হাসান মাসুম। আহত হন অসংখ্য মানুষ। একদিনে এত হত্যাকাণ্ড ফেনীর মানুষ আগে কখনও দেখেনি।

নিহতদের পরিবার এখনো শোক ও ক্ষোভে দিন কাটাচ্ছে। এক শহীদের মায়ের ভাষায়, “এক বছর পার হলেও আমরা এখনো কোনো বিচার দেখিনি। আমরা চাই মূল আসামিদের বিচার। আমরা চাই না আর কোনো মায়ের বুক খালি হোক।”

আন্দোলনে আহতরা জানান, হামলার পর শুধু রাস্তার ওপর নয়, এমনকি হাসপাতালে গিয়েও তারা নিরাপদ ছিলেন না। চিকিৎসা নিতে গিয়ে বাধা ও হামলার মুখোমুখি হয়েছেন তারা। অনেকেই দেরিতে চিকিৎসা নেন প্রাণের ভয়ে।

ফেনী জেলা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়কের মতে, শহীদদের ত্যাগ এখনো পূর্ণতা পায়নি, আর সরকারের উচিত ছিল আসামিদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা।

২২ মামলা, একটি চার্জশিট

ঘটনার পর মোট ২২টি মামলা হয়েছে—এর মধ্যে ৭টি হত্যা এবং ১৫টি হত্যাচেষ্টা মামলা। অভিযুক্ত ২ হাজার ১৯৯ জনের মধ্যে অনেকেই অজ্ঞাত। পুলিশ জানায়, এ পর্যন্ত এক হাজারের বেশি আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তবে অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। এক মামলায় ২২১ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে, যেখানে তৎকালীন শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।

পুলিশ সুপারের ভাষায়, “যারা মারা গেছে তাদের পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমাদের নেই। তদন্ত চলমান, আর যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তারা চার্জশিটে থাকবে—এখানে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না।”

প্রশাসনের অবস্থান

জেলা প্রশাসক জানান, ফেনীতে হতাহতের সংখ্যা অন্য জেলার তুলনায় বেশি ছিল। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় সাড়ে ৫ কোটি টাকার বেশি আর্থিক ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তিনি আশ্বাস দেন, শহীদদের ত্যাগ কখনো অবমূল্যায়িত হবে না।

প্রশ্ন রইল—এক বছর পরও যখন বিচার সম্পূর্ণ হয়নি, তখন এই ঘটনার সত্যিকারের সমাধান কি আদৌ সম্ভব হবে?

Next News Previous News