বাংলাদেশ-পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতায় কতটা অস্বস্তিতে ভারত?

দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতা নিয়ে দিল্লিতে অস্বস্তি বাড়ছে। প্রশ্ন উঠছে, এই সম্পর্ক কতটা ভারতের জন্য নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে?

প্রেক্ষাপট

ওমানের মাস্কটে এক বৈঠকে বাংলাদেশ সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার প্রস্তাব তোলে। তবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন, এখন সার্ক প্রসঙ্গ তোলার সময় নয়। দিল্লির মতে, সার্কের কার্যক্রম স্থবির হওয়ার পেছনে যে দেশ দায়ী, তা সবারই জানা। ভারত আশঙ্কা করছে, সার্কের প্রসঙ্গ পাকিস্তানের অবস্থানকেই সমর্থন করছে।

বাংলাদেশ-পাকিস্তানের সাম্প্রতিক উদ্যোগ

  • বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে চাল আমদানি করেছে এবং বাণিজ্য পুনরায় শুরু হয়েছে।
  • ভিসা শিথিল ও সরাসরি ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
  • শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান ও কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে পাকিস্তান।
  • সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের সফর বেড়েছে।

সর্বশেষ সফরে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশহাক দার শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নয়, বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এমনকি তিনি একাত্তরের মতো সংবেদনশীল ইস্যুকে “মীমাংসিত বিষয়” বলে উল্লেখ করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

ভারতের উদ্বেগ

ভারতের বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘনিষ্ঠতা নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভারসাম্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের স্থিতিশীলতা আবারও হুমকির মুখে পড়তে পারে। ভারতের প্রতিরক্ষা প্রধান জেনারেল অনিল চৌহান পর্যন্ত সতর্ক করে বলেছেন, “চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের স্বার্থে যে অভিন্নতা দেখা যাচ্ছে, তার প্রভাব ভারতের জন্য সুদূরপ্রসারী হতে পারে।”

ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি

লন্ডনভিত্তিক বিশ্লেষক প্রিয়জিৎ দেব সরকারের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে একক প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে না। বরং ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে সমানতালে দেখতে চাইছে। তাঁর ভাষায়, “ঢাকা ও ইসলামাবাদের নৈকট্যে ওয়াশিংটনেরও নীরব সমর্থন রয়েছে।”

ভাবধারাগত দিক

সাবেক ভারতীয় কর্মকর্তা শান্তনু মুখার্জির মতে, পাকিস্তান বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিজেদের মতাদর্শে দীক্ষিত করতে চাইছে। তাঁর ভাষায়, “তারা নতুন প্রজন্মকে জিন্নাহ বা ইকবালের ভাবধারায় গড়ে তুলতে চাইছে, যা রবীন্দ্রনাথের দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।” দিল্লির মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদে ভারতের সাংস্কৃতিক প্রভাবকে দুর্বল করতে পারে।

উপসংহার

সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা দিল্লিকে শুধু কূটনৈতিকভাবে নয়, নিরাপত্তা, ভূরাজনীতি ও সাংস্কৃতিকভাবেও চাপে ফেলছে। এখন প্রশ্ন হলো—এই নতুন আঞ্চলিক সমীকরণে ভারত কীভাবে নিজের অবস্থান ধরে রাখবে? এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ ভারসাম্য কোন দিকে যাবে?

Next News Previous News