তত্ত্বাবধায়ক বাতিলের রায়: আইনি ও নৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এক প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি
দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশ এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে, যার সূচনা হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের বিতর্কিত রায়ের মাধ্যমে। এই রায়ের নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। রাজনৈতিক ও আইনি মহলে এই রায় আজও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
২০১১ সালের মে মাসে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় দেয়। ছয় বিচারপতির মধ্যে তিনজন পক্ষে এবং তিনজন বিপক্ষে মত দেন। সমান ভোটে পরিস্থিতি গড়ালে প্রধান বিচারপতির কাস্টিং ভোটে রায় যায় বাতিলের দিকে। তবে রায়ে শর্ত ছিল, পরবর্তী দুটি জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে।
কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই সংক্ষিপ্ত রায়ের ভিত্তিতে দ্রুত সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল করে সরকার। সমালোচকদের মতে, এতে পুনর্বিবেচনার সুযোগ ইচ্ছাকৃতভাবে রুদ্ধ করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, পর্দার আড়ালে চাপ ও প্রভাবের মাধ্যমে রায়ের ভাষা পাল্টানো হয়েছিল।
আইন বিশেষজ্ঞ ও প্রাক্তন বিচারপতিদের মতে, অবসরের প্রায় ১৬ মাস পর এত সংবেদনশীল মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় লেখা ও স্বাক্ষর করা আইন ও সংবিধানবিরোধী ছিল। একইসঙ্গে প্রশ্ন ওঠে, কেন অবসরের ঠিক আগে বিচারপতি খায়রুল হক এই মামলার শুনানিতে এত আগ্রহ দেখালেন।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ মিলিয়ে এই বিষয়ে মোট ১২ জন বিচারপতি রায় দিয়েছেন। এর মধ্যে আটজন ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার পক্ষে এবং মাত্র চারজন বিপক্ষে। রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি আরও বিতর্কিত, কারণ ২০০৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে তত্ত্বাবধায়ক বাতিলের প্রতিশ্রুতি ছিল না। এমনকি বিশেষ সংসদীয় কমিটি ও বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞও ব্যবস্থাটি বহাল রাখার সুপারিশ করেছিলেন।
সমালোচকরা মনে করেন, এই রায়ের আইনি, নৈতিক ও সাংবিধানিক ভিত্তি ছিল দুর্বল এবং এটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক গ্রেপ্তার হয়েছেন। আইনজ্ঞরা বলছেন, তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলার মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হলে ভবিষ্যতে এমন বিতর্কিত পদক্ষেপের পুনরাবৃত্তি রোধ করা যাবে।
প্রশ্ন রইল—আইন ও বিচারব্যবস্থায় জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কি এই মামলাটি হতে পারে একটি বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র?
