ইতিহাসের সর্বোচ্চ সামরিক রপ্তানি করল ইসরাইল
বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের চাহিদা বৃদ্ধি এবং চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে ইতিহাসের সর্বোচ্চ সামরিক রপ্তানি করেছে ইসরাইল। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ইসরাইলের প্রতিরক্ষা খাতের রপ্তানি ১৯.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি।
এর মাধ্যমে টানা পঞ্চম বছরের মতো সামরিক রপ্তানিতে নতুন রেকর্ড গড়ল দেশটি। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের দাবি, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জামের বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধিই এই প্রবৃদ্ধির প্রধান কারণ।
মেগা-চুক্তির আধিক্য
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯.২ বিলিয়ন ডলারের মোট চুক্তির মধ্যে ৫৩ শতাংশই ছিল বড় আকারের বা ‘মেগা-ডিল’। এসব চুক্তির প্রতিটির আর্থিক মূল্য ছিল ১০০ মিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, বড় আকারের এসব চুক্তি ইঙ্গিত দেয় যে বিভিন্ন দেশ দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর অস্ত্র ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংগ্রহে আগ্রহী হয়ে উঠছে।
শীর্ষে ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইসরাইলের সামরিক রপ্তানির সবচেয়ে বড় অংশ দখল করেছে। মোট চুক্তির ২৯ শতাংশ এসেছে এই খাত থেকে।
এ ছাড়া পর্যবেক্ষণ ও অপট্রোনিক্স প্রযুক্তি ২২ শতাংশ এবং রাডার ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম ১১ শতাংশ অবদান রেখেছে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারি ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির বাড়তি গুরুত্ব এই খাতগুলোর চাহিদা বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইউরোপ সবচেয়ে বড় ক্রেতা
আঞ্চলিক বাজারের হিসাবে ইউরোপীয় দেশগুলো ইসরাইলি প্রতিরক্ষা পণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে উঠে এসেছে। মোট সামরিক রপ্তানির ৩৬ শতাংশ চুক্তি হয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল, যেখানে ৩২ শতাংশ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে ১৫ শতাংশ এবং উত্তর আমেরিকায় ১৩ শতাংশ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক আগ্রহ
ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর একাধিক ফ্রন্টে সামরিক অভিযান পরিচালনার ফলে দেশটির প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ইসরাইলি অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে।
তবে মানবাধিকার সংগঠন এবং সমালোচকদের একাংশ বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিকে বাণিজ্যিক সাফল্যের উপাদান হিসেবে উপস্থাপন করা নৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
বৈশ্বিক অস্ত্রবাজারে নতুন বাস্তবতা
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং এশিয়ার বিভিন্ন নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি বৈশ্বিক অস্ত্র ও নিরাপত্তা প্রযুক্তির বাজারে পড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া ও তুরস্কের মতো দেশগুলো প্রতিরক্ষা রপ্তানিতে নতুন সুযোগ পাচ্ছে। ইসরাইলের সাম্প্রতিক রপ্তানি রেকর্ড সেই বৈশ্বিক প্রবণতারই একটি প্রতিফলন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
বিশ্ব নিরাপত্তা পরিস্থিতি যত জটিল হচ্ছে, উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির চাহিদাও তত বাড়ছে। ফলে সামনের বছরগুলোতেও আন্তর্জাতিক অস্ত্রবাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
Source: Based on information released by Israel’s Ministry of Defense and international media reports.
