কাগজে-কলমে তিস্তা নেই অর্থায়ন নিয়ে জানতে চাইবে বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে অর্থনীতি, বাণিজ্য, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা জোরদারের প্রস্তুতি চলছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, সফরকালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ২০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ দলিল সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে একাধিক চুক্তি, সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং একটি কর্মপরিকল্পনা।

যদিও প্রস্তাবিত দলিলগুলোর মধ্যে বহুল আলোচিত তিস্তা প্রকল্পের বিষয়ে সরাসরি কোনো চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক নেই, তবুও দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পাবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতায় গুরুত্ব

সফরকালে সম্ভাব্য তিনটি প্রধান চুক্তির মধ্যে রয়েছে উন্নয়ন সহযোগিতা সংক্রান্ত একটি চুক্তি, মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ প্রকল্প এবং চীনা ভাষা শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বিষয়ক একটি সমঝোতা। বিশেষ করে মোংলা বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পকে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে এসব প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এআই, বাণিজ্য ও শিক্ষা খাতে নতুন সহযোগিতা

প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকগুলোর মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সবুজ জ্বালানি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বৃত্তিমূলক শিক্ষা, উচ্চমানের পণ্য রপ্তানি, গণমাধ্যম সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন সংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্যোগ।

এছাড়া বাংলাদেশ থেকে চীনে কৃষিপণ্য ও অন্যান্য মানসম্পন্ন পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর জন্য একটি পৃথক কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার কথাও আলোচনায় রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্যময় হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আলোচনায় থাকবে তিস্তা প্রকল্প

যদিও তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক দলিলের খসড়া নেই, তবুও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চীনের সম্ভাব্য অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা বিষয়ে আলোচনা করা হতে পারে।

তিস্তা অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ, নদী খনন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে কয়েক বছর আগে চীন একটি বড় প্রকল্প প্রস্তাব করেছিল। তবে প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তিস্তা শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি আঞ্চলিক ভূরাজনীতি ও পানি কূটনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। ফলে এ বিষয়ে যেকোনো অগ্রগতি বাংলাদেশ, চীন এবং ভারতের সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিআরআই নিয়ে নতুন আলোচনা

চীনের বৈশ্বিক অবকাঠামো উদ্যোগ ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) নিয়েও সফরে আলোচনা হবে বলে জানা গেছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং অবকাঠামোগত সংযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বেইজিং।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিআরআইয়ের বিভিন্ন প্রকল্পে অংশ নিয়েছে। তবে নতুন সরকার এ উদ্যোগে ভবিষ্যৎ অংশগ্রহণের ধরন ও অগ্রাধিকার বিষয়ে নতুন করে মূল্যায়ন করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য কী গুরুত্ব?

অর্থনীতিবিদদের মতে, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা সম্প্রসারণ বাংলাদেশের শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, যেকোনো আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে আর্থিক সক্ষমতা, জাতীয় স্বার্থ এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্যের বিষয়গুলো সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সফরটি বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের নতুন অধ্যায় সূচনার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র: কূটনৈতিক সূত্র ও সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত।

Next News Previous News