ছাড় করা অর্থ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য কেনার দাবি ভিত্তিহীন: ইরানের স্পিকার
ইরানের অবমুক্ত আর্থিক সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ব্যাখ্যা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও আলোচক দলের অন্যতম প্রধান সদস্য মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, অবমুক্ত অর্থ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য কেনার দাবি সঠিক নয়। তিনি এ ধরনের বক্তব্যকে ভিত্তিহীন বলে অভিহিত করেছেন এবং ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগ তুলেছেন।
সম্প্রতি পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত একটি সমঝোতা স্মারককে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক সামনে এসেছে। চুক্তির ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়ন নিয়ে উভয় পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাওয়ায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গালিবাফের কড়া প্রতিক্রিয়া
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে গালিবাফ বলেন, ইরানের অবমুক্ত সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য কেনার জন্য ব্যয় হবে—এমন দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতির কারণে দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং নীতিগত অবস্থানের কারণে ওয়াশিংটনের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে বলেন, তাদের কথার চেয়ে বাস্তব পদক্ষেপই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী?
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, সমঝোতা স্মারকের প্রাথমিক ধাপে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের মার্কিন পণ্য অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তার মতে, অর্থ সরাসরি ইরানের হাতে না গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকদের কাছ থেকে ভুট্টা, গমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য কেনার কাজে ব্যবহৃত হবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি হলো, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে একদিকে ইরানের খাদ্যসংকট মোকাবিলায় সহায়তা করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে মার্কিন কৃষকরাও অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবেন।
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি বলেছেন, অবমুক্ত অর্থের একটি অংশ কৃষিপণ্য আমদানিতে ব্যবহার করা হলে উভয় দেশের জনগণই এর সুফল পেতে পারে।
চুক্তির ব্যাখ্যায় দুই দেশের ভিন্ন অবস্থান
ইরানের রাষ্ট্রীয় ও আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যমগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয়। তাদের মতে, এই সমঝোতা কোনো ধরনের ছাড় নয়; বরং এটি ইরানের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের একটি অর্জন।
আজারবাইজানের রাজধানী বাকু সফরকালে গালিবাফ বলেন, চুক্তিতে এমন কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই, যা ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট কোনো পণ্য কিনতে বাধ্য করবে। ফলে অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ইরানেরই থাকবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বক্তব্য
ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরও সম্প্রতি জানিয়েছেন, অবমুক্ত হওয়া অর্থ শুধু খাদ্য বা জরুরি পণ্য আমদানির জন্য সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন খাতে এই অর্থ ব্যবহার করা যেতে পারে।
তার এই বক্তব্যও যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থাপিত পরিকল্পনার সঙ্গে কিছুটা সাংঘর্ষিক বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে কোনো অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি বাজার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এসব চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ওয়াশিংটন এমন একটি সমঝোতা চায় যা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা
সমঝোতা স্মারক কার্যকর হলেও এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি, অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্র এবং উভয় পক্ষের দায়বদ্ধতা নিয়ে আলোচনা এখনও চলমান। ফলে অবমুক্ত অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে, চুক্তির ব্যাখ্যা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মতপার্থক্য অব্যাহত রয়েছে। এই মতবিরোধ ভবিষ্যতে আলোচনার গতিপথে কী প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজরে।
সূত্র: আমার দেশ, মেহের নিউজ এজেন্সি ও সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রস্তুত।
