ইরান চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চায় উপসাগরীয় দেশগুলো
ইরানের সঙ্গে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য যেকোনো কূটনৈতিক সমঝোতা বা চুক্তির আগে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি চাইছে উপসাগরীয় দেশগুলো। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং পাল্টাপাল্টি হামলার অভিজ্ঞতা তাদের এই অবস্থানকে আরও জোরালো করেছে।
বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্র মনে করছে, ইরানকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো সমঝোতা হলে তাদের নিরাপত্তা স্বার্থ, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং জ্বালানি রপ্তানি পথের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। বিষয়টি বর্তমানে অঞ্চল সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে বাড়ছে উদ্বেগ
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাত চলাকালে উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখোমুখি হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, যুদ্ধের সময় দেশটি প্রায় ২ হাজার ৮০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকি বা প্রভাব মোকাবিলা করেছে।
এই পরিস্থিতি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। উপসাগরীয় দেশগুলো মনে করছে, ভবিষ্যতে কোনো সংঘাত দেখা দিলে তাদের ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো আবারও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
কুয়েতের ‘রেড লাইন’ অবকাঠামো
মার্কো রুবিওর সফরসূচিতে কুয়েতও রয়েছে। যুদ্ধকালীন সময়ে দেশটির বিমানবন্দর, বাণিজ্যিক বন্দর এবং পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনাগুলো হুমকির মুখে পড়েছিল বলে জানা গেছে।
বিশেষ করে লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোকে কুয়েত জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। কারণ দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ সুপেয় পানির চাহিদা এসব প্ল্যান্টের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এসব স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কুয়েতের জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা বড় উদ্বেগ
উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন করা হয়।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতারসহ জ্বালানি রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতির জন্য এই রুট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো সমঝোতা হলে সেখানে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।
কূটনৈতিক ভারসাম্যের নতুন চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক উন্নয়নই যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। ফলে নতুন কোনো সমঝোতা চুক্তি হলে ওয়াশিংটনের ওপর এসব দেশের প্রত্যাশাও বাড়ছে। তারা এমন নিশ্চয়তা চায়, যাতে ভবিষ্যতে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরানকে ঘিরে ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক আলোচনা শুধু পারমাণবিক বা সামরিক ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।
সূত্র: আলজাজিরার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রস্তুত।
