কণ্ঠে গুমের অধ্যাদেশ বাতিল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ ব্যারিস্টার আরমানের
গুম প্রতিরোধ আইন নিয়ে সংসদে আবেগঘন বিতর্ক, ক্ষোভ প্রকাশ ব্যারিস্টার আরমানের
জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ’ ঘিরে রোববার আবেগঘন ও তাৎপর্যপূর্ণ বিতর্ক দেখা গেছে। ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান অধ্যাদেশটি বাতিলের সুপারিশে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, গুমের শিকার পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করে আইনটি বাতিল বা ঝুলিয়ে রাখা হলে ভুক্তভোগীদের প্রতি তা গভীর অবিচার হবে। 0
তিনি সংসদে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, “আমি একটি অন্ধকার ঘর থেকে ফিরে এসে এখানে দাঁড়িয়ে আছি,”—যেখানে দিন-রাতের পার্থক্য বোঝা যেত না এবং প্রতিটি মুহূর্ত ছিল মৃত্যুর প্রহর গোনার মতো। তার বক্তব্যে গুমের মানবিক ও মানসিক ক্ষত আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।
1অধ্যাদেশ বাতিল নাকি আরও শক্তিশালী আইন?
সম্প্রতি সংসদের বিশেষ কমিটি অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করে ১৬টি অধ্যাদেশ আরও যাচাই-বাছাইয়ের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশও রয়েছে। কমিটির মতে, আইনটি সরাসরি অনুমোদন না দিয়ে আরও যুগোপযোগী ও শক্তিশালী করে বিল আকারে পুনরায় সংসদে আনা উচিত। 2
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সংসদে বলেন, বিদ্যমান খসড়ায় তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে অন্যান্য আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু ধারা রয়েছে। বিশেষ করে আইসিটি আইনে গুমের সংজ্ঞা ও সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান এবং পৃথক গুম আইনের সাজা কাঠামোর মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে। এ কারণে আইনটি আরও পরিমার্জন করে চলতি অধিবেশন বা পরবর্তী অধিবেশনে বিল আকারে উপস্থাপন করা হবে। 3
গুমের শিকার পরিবারগুলোর উদ্বেগ
ব্যারিস্টার আরমানের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রধান উদ্বেগ হলো—আইনটি বাতিল হলে গুমের অপরাধের স্পষ্ট সংজ্ঞা এবং বিচার প্রক্রিয়ার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তিনি বলেন, প্রয়োজনে আইনটি সংশোধন করা হোক, কিন্তু আগে এটিকে পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত করতে হবে।
বাংলাদেশে গুমের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, দ্রুত বিচার এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান নিয়ে আগের অধ্যাদেশে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। 4
রাজনৈতিক ও মানবাধিকার প্রেক্ষাপট
এই বিতর্ক শুধু একটি আইনকে কেন্দ্র করে নয়; বরং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস, মানবাধিকার এবং বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। সংসদে আলোচনার সময় আইনমন্ত্রীও উল্লেখ করেন যে, গুমের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা যেন আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারে, সেদিকে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আইনটি নিয়ে দ্রুত অংশীজনভিত্তিক আলোচনা এবং ভুক্তভোগীদের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।
উপসংহার
গুম প্রতিরোধ আইন নিয়ে সংসদের এই আলোচনা দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও বিচার সংস্কারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এখন দেখার বিষয়, সরকার কত দ্রুত একটি কার্যকর, স্পষ্ট ও ভুক্তভোগীবান্ধব আইন সংসদে আনতে পারে।
