মাদুরোর আগে সাদ্দামসহ আরও যেসব প্রেসিডেন্টকে আটক করেছিল যুক্তরাষ্ট্র
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র আটক করেছে—এমন দাবিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। কারাকাসসহ বিভিন্ন স্থানে মার্কিন হামলার খবর প্রকাশের পর এই দাবি সামনে আসে, যা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটি প্রথম ঘটনা নয়—এর আগেও বিভিন্ন সময়ে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের আটক করেছে ওয়াশিংটন, যার কয়েকটি ঘটনা আজও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা শুধু সামরিক বা আইনি পদক্ষেপ নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি, ক্ষমতার প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। মাদুরোকে ঘিরে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই পুরোনো বিতর্ককেই আবার সামনে এনেছে।
পানামায় সামরিক অভিযান ও নোরিগার গ্রেপ্তার
১৯৮৯ সালে লাতিন আমেরিকার দেশ পানামায় পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। সেই অভিযানে দেশটির তৎকালীন শাসক ম্যানুয়েল নোরিগাকে আটক করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, পানামায় অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই হামলা চালানো হয়েছিল।
নোরিগা একসময় যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ আনে ওয়াশিংটন। ১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামির একটি আদালতে তাকে মাদক চোরাচালানের মামলায় অভিযুক্ত করা হয়। এই আইনি প্রক্রিয়াকে ভিত্তি করেই এক বছর পর সামরিক অভিযান চালানো হয় পানামায়।
নোরিগা ১৯৮৫ সালে ক্ষমতায় আসেন এবং ১৯৮৯ সালের নির্বাচন বাতিল করেন। একই সঙ্গে তিনি দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন জানান। এসব ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র তাকে গ্রেপ্তার করে নিজের দেশে নিয়ে যায়। সেখানে তিনি ২০১০ সাল পর্যন্ত কারাভোগ করেন। পরবর্তীতে আরেকটি মামলায় তাকে ফ্রান্সে পাঠানো হলেও এক বছর পর আবার পানামায় ফেরত পাঠানো হয়। ২০১৭ সালে পানামার কারাগারেই তার মৃত্যু হয়।
ইরাক যুদ্ধ ও সাদ্দাম হোসেনের পতন
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত রাষ্ট্রপ্রধান গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে ২০০৩ সালে, যখন ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে আটক করা হয়। এর আগে একই বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করে।
ওয়াশিংটনের দাবি ছিল, ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে এবং সাদ্দাম হোসেন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদাকে সহায়তা করছেন। তবে পরবর্তী সময়ে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা যুক্তরাষ্ট্রের ওই সিদ্ধান্তকে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর ইরাকের তিকরিত শহরের কাছে একটি গুহা থেকে সাদ্দাম হোসেনকে আটক করে মার্কিন সেনারা। এরপর তাকে ইরাকের একটি আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর আপত্তি সত্ত্বেও ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
মিত্র থেকে শত্রু—একই ধারা
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নোরিগা ও সাদ্দাম—উভয়েই একসময় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ছিলেন। বিশেষ করে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সাদ্দাম হোসেন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পেয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে ভূরাজনৈতিক স্বার্থের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই নেতারাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শত্রুতে পরিণত হন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারাবাহিকতা দেখায় যে যুক্তরাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন নয়, বরং নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মাদুরো ইস্যুতে বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার দাবিকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে রাশিয়া ও কয়েকটি লাতিন আমেরিকান দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা একে ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সব তথ্য স্পষ্ট না করায় বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই ঘটনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বড় শক্তিগুলোর এমন পদক্ষেপ বৈশ্বিক রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে।
উপসংহার
মাদুরোকে ঘিরে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নতুন হলেও যুক্তরাষ্ট্রের অতীত নজিরগুলো দেখায়, বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের আটক করা তাদের জন্য একেবারে অচেনা বিষয় নয়। এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য, আইনের প্রয়োগ এবং সার্বভৌমত্বের সীমা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
Source: Based on reporting from Dhaka Post.
