ইতালি যাওয়ার প্রলোভনে সাগরে মৃত্যু : মানবপাচার চক্রের ২ সদস্য গ্রেপ্তার
ইতালিতে কাজের সুযোগের প্রলোভন দেখিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপে পাঠানোর সময় সাগরে ডুবে আট বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনায় মানবপাচার চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। দীর্ঘ তদন্তের পর এই গ্রেপ্তারকে মানবপাচারবিরোধী অভিযানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
গ্রেপ্তার ও মামলার বিবরণ
সিআইডি সূত্র জানায়, মাদারীপুর জেলার রাজৈর এলাকা থেকে গত ১২ জানুয়ারি গ্রেপ্তার করা হয় গুরুদাস বরই (৪৫) ও মো. মোতালেব মাতুব্বর (৬৮) নামের দুই অভিযুক্তকে। তারা আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের স্থানীয় পর্যায়ের সংগঠক হিসেবে কাজ করছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
সিআইডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অভিযুক্তরা ইতালিতে বৈধ চাকরি ও নিরাপদ যাত্রার আশ্বাস দিয়ে প্রত্যেক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে প্রায় ১৪ লাখ টাকা করে আদায় করেন। পরে তাদের অবৈধভাবে লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ নৌযানে তোলা হয়।
ভূমধ্যসাগরে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিউনিসিয়ার উপকূলের কাছে ওই নৌযানটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ডুবে যায়। এতে নৌযানে থাকা আট বাংলাদেশির সবাই প্রাণ হারান। নিহতরা সবাই তরুণ এবং কর্মসংস্থানের আশায় ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মরদেহ তিউনিসিয়ার বিভিন্ন হাসপাতালে শনাক্তের পর কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এই ঘটনায় পরিবারগুলোর ওপর নেমে আসে গভীর শোক ও আর্থিক বিপর্যয়।
আইনি প্রক্রিয়া ও তদন্ত
ঘটনার পর নিহতদের একজনের বাবা রাজধানীর বিমানবন্দর থানায় মানবপাচার ও দমন আইন, ২০১২ অনুযায়ী মামলা দায়ের করেন। পরে মামলাটির তদন্তভার নেয় সিআইডি। তদন্তে অভিযুক্তদের আর্থিক লেনদেন, বিদেশি যোগাযোগ এবং চক্রের অন্য সদস্যদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সিআইডি কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেপ্তার হওয়া দুজন মূল সংগঠক নন; তারা চক্রের মধ্যবর্তী পর্যায়ের সদস্য। এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে আরও কয়েকজন দেশি ও বিদেশি দালালের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশে অবৈধ অভিবাসনের বাস্তবতা
বাংলাদেশ থেকে অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে। বেকারত্ব, দারিদ্র্য এবং দ্রুত আয় করার আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে মানবপাচারকারীরা সহজ-সরল মানুষকে ফাঁদে ফেলছে। বিশেষ করে মাদারীপুর, ফরিদপুরসহ কয়েকটি জেলা থেকে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় আগ্রহ বেশি দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবৈধ পথে ইউরোপগামীদের বড় একটি অংশ সাগরপথে মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়ে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাবে, ভূমধ্যসাগর বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক অভিবাসন রুটগুলোর একটি।
উপসংহার
মানবপাচার চক্রের দুই সদস্যের গ্রেপ্তার নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু গ্রেপ্তার নয়—জনসচেতনতা বৃদ্ধি, বৈধ অভিবাসন পথ সম্প্রসারণ এবং পাচার চক্রের আর্থিক শেকড় ভেঙে দেওয়াই পারে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাণহানি রোধ করতে।
Source: Based on reporting from Dhaka Post and other Bangladeshi news outlets.
