আর হামলা ও সরকার পতনও নয়, যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ভেনেজুয়েলাকে চালাবে
ওয়াশিংটন–কারাকাস—দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ ও সরকার পরিবর্তনের অভিযোগের পর ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে নতুন কৌশলের পথে হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্র। সামরিক হামলা বা সরাসরি সরকার পতনের পথ এড়িয়ে, দেশটির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা কাঠামোর ভেতর থেকেই প্রভাব বিস্তারের পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন। সাম্প্রতিক ঘটনায় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর আটক হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য এই কৌশলকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
ট্রাম্পের মন্তব্য ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
মাদুরো আটক হওয়ার পর ট্রাম্প বলেন, এখন থেকে ভেনেজুয়েলা “যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে” চলবে। তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিস্ময় ও প্রশ্নের জন্ম দেয়। কীভাবে কোনো দেশকে সরাসরি সামরিক অভিযান ছাড়াই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব—এই প্রশ্নই উঠে আসে সবচেয়ে বেশি।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে ওয়াশিংটনের ভেনেজুয়েলা কৌশলের সম্ভাব্য রূপরেখা তুলে ধরা হয়।
চাপ, নিষেধাজ্ঞা ও ব্যর্থ সামরিক ভয়
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র মাদুরো সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করতে বিভিন্ন মাত্রার চাপ প্রয়োগ করে আসছিল। এর মধ্যে ছিল ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে নৌ তৎপরতা বৃদ্ধি, ভেনেজুয়েলার তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ এবং একটি ডকে হামলার ঘটনা। তবে এসব পদক্ষেপ মাদুরোকে নীতিগতভাবে নরম করতে ব্যর্থ হয়।
বরং তিনি এসব চাপকে উপেক্ষা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাচের ভিডিওসহ নানা প্রতীকী বার্তা দেন, যা ট্রাম্প প্রশাসনের একটি অংশে অসন্তোষ তৈরি করে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এতে মনে হয়েছে মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
ডেলসি রদ্রিগেজকে কেন্দ্র করে নতুন পরিকল্পনা
মার্কিন সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, সামরিক অভ্যুত্থানের পরিবর্তে ভেনেজুয়েলার ক্ষমতার ভেতর থেকেই কাজ করার কৌশল নেয় ট্রাম্প প্রশাসন। এ পরিকল্পনায় কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে উঠে আসে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের নাম।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদুরো আটক হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগেই যুক্তরাষ্ট্র রদ্রিগেজকে সম্ভাব্য বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে বিবেচনা করে। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার তেল শিল্প পরিচালনায় তার দক্ষতা মার্কিন প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তিনি তেল উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হন, যা ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিকে আংশিকভাবে স্থিতিশীল করে।
মার্কিন স্বার্থ ও বিনিয়োগ সুরক্ষার হিসাব
সূত্রগুলো জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকারীরা ট্রাম্প প্রশাসনকে আশ্বস্ত করেছেন যে রদ্রিগেজ দায়িত্বে এলে তিনি ভবিষ্যতে মার্কিন বিনিয়োগ ও জ্বালানি স্বার্থ রক্ষায় সহযোগিতা করবেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, “তিনি নিখুঁত সমাধান নন, কিন্তু এমন একজন নেতা যার সঙ্গে আমরা কাজ করতে পারি।”
মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে কেন বাদ
এই কৌশলে উল্লেখযোগ্যভাবে বাদ পড়েছেন বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিরোধী জোটকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও ট্রাম্প প্রশাসন তাকে ক্ষমতায় দেখতে আগ্রহী নয়।
ট্রাম্পের যুক্তি, ভেনেজুয়েলা পরিচালনার মতো পর্যাপ্ত জনসমর্থন মাচাদোর নেই। একইভাবে পশ্চিমা দেশগুলোর ভাষ্যমতে নির্বাচনে জয়ী এডমুন্ড গঞ্জালেজের নামও যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় অনুপস্থিত।
সহযোগিতা না হলে সামরিক পথ খোলা
মার্কিন কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, রদ্রিগেজের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ভর করবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে কতটা অনুসরণ করছেন তার ওপর। এক কর্মকর্তা বলেন, প্রয়োজনে ভবিষ্যতে আবারও সামরিক বিকল্প বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।
যদিও রদ্রিগেজ প্রকাশ্যে মাদুরো আটক হওয়ার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, তবুও ওয়াশিংটন আপাতত তার অবস্থান পর্যবেক্ষণ করছে।
সমাপনী বিশ্লেষণ
সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান সরাসরি শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের দিকে ঝুঁকছে। এই পদ্ধতি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে রদ্রিগেজের ভূমিকা ও ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর। তবে এটুকু স্পষ্ট—লাতিন আমেরিকার এই দেশটি নিয়ে ওয়াশিংটনের ভূরাজনৈতিক আগ্রহ নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
Source: Based on reporting from The New York Times and international media analysis
