টেকনাফে গুলিবিদ্ধ শিশুটি মারা যায়নি, ৫৩ বিদ্রোহী আটক

কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে চলমান সংঘর্ষের প্রভাব এবার সরাসরি বাংলাদেশ ভূখণ্ডে এসে পড়েছে। সীমান্তের কাছে গোলাগুলির ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হওয়া নয় বছর বয়সী এক শিশু বর্তমানে জীবিত এবং চিকিৎসাধীন রয়েছে। একই ঘটনায় বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করার সময় মিয়ানমারের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর অন্তত ৫৩ জন সদস্যকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

স্থানীয় প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যমতে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে আরকান আর্মি (এএ) এবং রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে টানা চার দিন ধরে সংঘর্ষ চলছে। শনিবার দিবাগত রাত থেকে রোববার ভোর পর্যন্ত সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়, যা টেকনাফের একাধিক গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।

ড্রোন হামলার পর সীমান্তে উত্তেজনা

রোববার ভোর ছয়টা পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময় অব্যাহত ছিল বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। এ সময় আরকান আর্মি রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে একাধিক ড্রোন হামলা চালায়। হামলার মুখে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা পিছু হটলে আরকান আর্মির কিছু সদস্য তাদের ধাওয়া করতে গিয়ে বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করে ভেতরে অনুপ্রবেশ করে বলে অভিযোগ ওঠে।

এই অনুপ্রবেশের সময় টেকনাফের একটি বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকায় এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে হুজাইফা সুলতানা আফনান (৯) নামে এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়, পরে অবস্থার অবনতি হলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

শিশুটির বর্তমান অবস্থা

হুজাইফার বাবা জসিম উদ্দিন জানান, সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে তার মেয়ে বাড়ির সামনে খেলছিল। হঠাৎ করে সীমান্তের দিক থেকে গুলির শব্দ আসে এবং একপর্যায়ে একটি গুলি তার মেয়ের শরীরে লাগে। দ্রুত স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটির অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল। সময়মতো চিকিৎসা পাওয়ায় বড় ধরনের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে চিকিৎসকরা তাকে পর্যবেক্ষণে রাখার কথা জানিয়েছেন।

৫৩ জন আটক, নিরাপত্তা জোরদার

এ ঘটনার পর বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথ অভিযান চালিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ৫৩ জন সশস্ত্র সদস্যকে আটক করে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে তিন থেকে চারজন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ছিলেন বলে নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত বিজিবি ও সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ঘটনার পর স্থানীয় জনগণের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হলে একপর্যায়ে সড়ক অবরোধ করা হয়, তবে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে দ্রুত তা প্রত্যাহার করা হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য সীমান্ত পরিস্থিতির গুরুত্ব

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাখাইন রাজ্যের চলমান সংঘর্ষ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে নতুন করে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। অতীতেও এ ধরনের সংঘর্ষের প্রভাব বাংলাদেশে শরণার্থী অনুপ্রবেশ ও সীমান্ত উত্তেজনার কারণ হয়েছে। ফলে সীমান্ত নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।

উপসংহার: টেকনাফের এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল যে প্রতিবেশী দেশের সংঘর্ষের প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষের জীবনে আঘাত হানতে পারে। গুলিবিদ্ধ শিশুটি বেঁচে যাওয়াকে স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হলেও, সীমান্তে স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Source: Based on reporting from আমার দেশ অনলাইন ও স্থানীয় প্রশাসন

Next Post Previous Post

Advertisement