রেজা পাহলভিকে ঘিরে বিক্ষোভ, রাজতন্ত্রে ফিরতে চায় কি ইরানিরা?
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ নতুন করে আলোচনায় এনেছে দেশটির সর্বশেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পুত্র রেজা পাহলভিকে। প্রায় পাঁচ দশক আগে ইসলামী বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত রাজতন্ত্রের উত্তরাধিকারী এই নেতা এখন আবার বিক্ষোভকারীদের স্লোগানে উঠে আসছেন। প্রশ্ন উঠছে—এটি কি সত্যিই রাজতন্ত্রে ফেরার আকাঙ্ক্ষা, নাকি বর্তমান ধর্মতান্ত্রিক শাসনের প্রতি চরম হতাশার বহিঃপ্রকাশ?
বিক্ষোভে কেন উঠছে পাহলভির নাম
সম্প্রতি ইরানের বিভিন্ন শহরে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত সরকার ও শাসনব্যবস্থাবিরোধী রূপ নেয়। এই বিক্ষোভে শোনা যায়, “এটাই শেষ লড়াই, পাহলভি ফিরবে” এবং “জাভিদ শাহ” বা “রাজা দীর্ঘজীবী হোন”—এমন স্লোগান। কোথাও কোথাও বিক্ষোভকারীরা রেজা শাহের স্মরণে শ্রদ্ধাসূচক স্লোগানও দেন।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত রেজা পাহলভি প্রকাশ্যে জনগণকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানালে তার নাম আন্দোলনে আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। যদিও ইরানে রাজতন্ত্রের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন আইনত নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
রেজা পাহলভি: উত্তরাধিকারী থেকে নির্বাসিত নেতা
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের সময় মাত্র ১৬ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন রেজা পাহলভি। হাজার বছরের রাজতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটে এবং ইরান পরিণত হয় একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্রে। সেই সময়ই কার্যত শেষ হয়ে যায় তার সিংহাসনে বসার সম্ভাবনা।
তবে নির্বাসনে থেকেও তিনি ধীরে ধীরে প্রবাসী ইরানি বিরোধীদের মধ্যে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে ২০২০ সালে ভুলবশত যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনার পর তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশি আলোচনায় আসেন।
রাজতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা নাকি হতাশার প্রতীক?
বিশ্লেষকদের মতে, রেজা পাহলভিকে ঘিরে সাম্প্রতিক আগ্রহ রাজতন্ত্রে ফেরার সুস্পষ্ট দাবি নয়। বরং এটি বর্তমান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতি জনগণের গভীর অসন্তোষ ও হতাশার প্রতিফলন। গবেষক ও লেখক আরাশ আজিজির ভাষায়, পাহলভি বিরোধী রাজনীতিতে প্রভাব বাড়ালেও তিনি এমন নেতা নন যিনি সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেন।
ইরানে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিরোধিতা কঠোরভাবে দমন করা হচ্ছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হাতে চূড়ান্ত ক্ষমতা থাকায় নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা সীমিত। এই বাস্তবতায় দেশের ভেতরের চেয়ে প্রবাসী ইরানিদের মধ্যেই বিরোধী রাজনীতি বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা
রেজা পাহলভি নিজে বলেছেন, বিক্ষোভ সফল হলে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত। তবে কীভাবে সেই অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হবে, কারা সেখানে থাকবেন—এসব বিষয়ে তিনি এখনো স্পষ্ট কোনো রূপরেখা দেননি। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভালি নাসরের মতে, এই অনিশ্চয়তাই তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রকাশ্য সমর্থন পাহলভিকে ঘিরে ইরানি সমাজে নতুন বিতর্কও তৈরি করেছে, যা তার গ্রহণযোগ্যতাকে জটিল করে তুলছে।
ইরানের সংকট ও তরুণদের ভূমিকা
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাব—সব মিলিয়ে ইরান এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি হতাশ। অধ্যাপক নাসরের ভাষায়, “ইরানিরা পাহলভিকে বেছে নিচ্ছে তার রাজনৈতিক পরিকল্পনার জন্য নয়, বরং বিকল্পের অভাব ও চরম হতাশা থেকেই।”
এই বাস্তবতায় রেজা পাহলভি অতীতের স্মৃতি ও প্রতীকী অবস্থানকে সামনে এনে নিজেকে তুলে ধরছেন। তিনি নিজেই বলেছেন, বয়স্করা তার জন্মদিনের স্মৃতি মনে করেন, আর তরুণরা তাকে ‘বাবা’ বলে ডাকছে—যা তার কাছে আবেগী স্বীকৃতি।
সূত্র: সিএনএন-এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে
