মাদুরোকে তুলে নিতে যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করে তারই যে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করার ঘটনা হঠাৎ ঘটেনি। বরং এই অভিযান বাস্তবায়নের পেছনে কয়েক মাস ধরে সূক্ষ্ম পরিকল্পনা, মহড়া এবং ভেতরের তথ্য সংগ্রহে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তৎপরতা ছিল বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদুরোর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সহায়তা করেছেন, যিনি অভিযানের সময় তাঁর অবস্থান সংক্রান্ত নির্ভুল তথ্য সরবরাহ করেন।

এই ঘটনাকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও দুঃসাহসিক আন্তর্জাতিক অভিযান হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে এর প্রভাব যেমন গভীর, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র–ভেনেজুয়েলা সম্পর্কেও এটি নতুন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।

কারাকাসে সমন্বিত সামরিক অভিযান

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (৩ জানুয়ারি) রাতে স্থানীয় সময় রাজধানী কারাকাসসহ ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন স্থানে একযোগে অভিযান চালায় মার্কিন বাহিনী। এই অভিযানের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করা হয়।

বর্তমানে মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে একটি আটককেন্দ্রে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস কোথায় আছেন, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

ট্রাম্পের বক্তব্য ও ‘দুঃসাহসিক অভিযান’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, মাদুরো দম্পতিকে ধরতে মার্কিন বাহিনী একটি ‘দুঃসাহসিক অভিযান’ পরিচালনা করেছে।

ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অভিযানে ডেল্টা ফোর্সসহ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর এলিট ইউনিট অংশ নেয়। তারা মাদুরোর একটি নিরাপদ আবাসস্থল থেকে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তাঁকে আটক করে নিরাপদে সরিয়ে নেয়।

সেফ হাউসের প্রতিরূপে মহড়া

রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অভিযানের আগে মাদুরোর সেফ হাউসের হুবহু একটি প্রতিরূপ তৈরি করে সেখানে প্রবেশ ও বেরিয়ে আসার কৌশল নিয়ে একাধিকবার মহড়া দেওয়া হয়। এতে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও বাধাগুলো আগেই চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।

এই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মার্কিন এলিট বাহিনী কয়েক দফা সিমুলেশন অনুশীলন চালায়, যাতে বাস্তব অভিযানের সময় কোনো অনিশ্চয়তা না থাকে।

হোয়াইট হাউসের ‘কোর টিম’

একাধিক সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানায়, এই অভিযানের পরিকল্পনায় হোয়াইট হাউসের শীর্ষ পর্যায়ের একটি ‘কোর টিম’ সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে। এতে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ সহযোগী স্টিফেন মিলার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ।

এই দলটি কয়েক মাস ধরে নিয়মিত বৈঠক করেছে—কখনো সরাসরি, কখনো ফোনে। অনেক সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও এসব আলোচনায় যুক্ত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিআইএর গোপন উপস্থিতি ও ঘনিষ্ঠ তথ্যদাতা

রয়টার্স জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর একটি ছোট দল গত আগস্ট মাস থেকেই ভেনেজুয়েলায় সক্রিয় ছিল। তারা মাদুরোর দৈনন্দিন চলাফেরা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অভ্যাস সম্পর্কে গভীর ধারণা সংগ্রহ করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আসে মাদুরোর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন ব্যক্তির কাছ থেকে, যিনি সিআইএর ‘অ্যাসেট’ হিসেবে কাজ করছিলেন বলে দাবি করেছে দুটি সূত্র। ওই ব্যক্তি অভিযানের সময় মাদুরোর সঠিক অবস্থান সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহ করেন, যা পুরো অভিযানের সফলতা নিশ্চিত করে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও সম্ভাব্য প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক করতে অভ্যন্তরীণ সহযোগী ব্যবহারের বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গভীর প্রশ্ন তৈরি করে। এটি ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভাঙন ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সক্ষমতার দিকটিও স্পষ্ট করেছে।

এদিকে মাদুরোর আটক ও তাঁর ভবিষ্যৎ আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ ও আলোচনা বাড়ছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থার ভূমিকা এবং ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন বিশ্ব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

Source: Based on reporting from Reuters

Next Post Previous Post

Advertisement