আপনিও ক্ষমতাচ্যুত হবেন’, ট্রাম্পকে হুঁশিয়ারি খামেনির
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাকে ‘অত্যাচারী ব্যক্তি’ আখ্যা দিয়ে খামেনি বলেছেন, ইতিহাসের অন্য স্বৈরশাসকদের মতো ট্রাম্পও শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাচ্যুত হবেন। ইরানে চলমান নজিরবিহীন গণবিক্ষোভ, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ এবং কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
শুক্রবার দুপুরে রাষ্ট্রায়ত্ত ইরানি টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে খামেনি বলেন, “ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো অত্যাচারী দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না। ফারাও, নমরুদ কিংবা মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি— কেউই পারেনি। ডোনাল্ড ট্রাম্পও পারবেন না। তাকেও ক্ষমতা থেকে নামানো হবে।”
বিক্ষোভকারীদের নিয়ে কঠোর ভাষা
ভাষণে খামেনি ইরানের বিক্ষুব্ধ জনগণকে ‘নাশকতাকারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তার অভিযোগ, এই আন্দোলনকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে খুশি করতে এবং ইরানে হামলার জন্য উসকানি দিতেই বিক্ষোভে নেমেছেন। খামেনির ভাষায়, “তারা এমন একজন মানুষকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করছে, যিনি নিজের দেশই ঠিকভাবে চালাতে জানেন না।”
তিনি আরও বলেন, ট্রাম্পের উচিত আগে নিজের দেশ পরিচালনার পদ্ধতি শেখা এবং সেটির বাস্তব প্রয়োগ করা। ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকার পতনের সম্ভাবনা নাকচ
খামেনি স্পষ্টভাবে দাবি করেন, এই আন্দোলনের মাধ্যমে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটানো সম্ভব নয়। তার মতে, “এই সরকার লাখ লাখ সম্মানিত মানুষের রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিছু নাশকতাকারীর তৎপরতায় এই রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়বে না।” বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য সরকারের কঠোর অবস্থানেরই প্রতিফলন।
বিক্ষোভের পটভূমি: অর্থনৈতিক সংকট
দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের অর্থনীতি চরম চাপে রয়েছে। ইরানি রিয়ালের ব্যাপক অবমূল্যায়ন, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে গত ২৮ ডিসেম্বর রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা ধর্মঘটের ডাক দেন। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে।
মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সব শহর ও গ্রামে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে বহু এলাকায় স্বাভাবিক জীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রাণহানি
বিক্ষোভ দমাতে সরকার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাময়িকভাবে ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবুও উত্তেজনা প্রশমিত হয়নি। সরকারি ও আন্তর্জাতিক সূত্র অনুযায়ী, আন্দোলন শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৪৫ জন নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
বিক্ষোভের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী যদি অতিরিক্ত কঠোর দমননীতি গ্রহণ করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। এই মন্তব্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
উপসংহার
খামেনির বক্তব্য স্পষ্ট করছে যে ইরানের নেতৃত্ব কোনো ধরনের আপসের পথে হাঁটতে প্রস্তুত নয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। অর্থনৈতিক সংকট থেকে জন্ম নেওয়া এই বিক্ষোভ শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তা শুধু ইরান নয়— পুরো অঞ্চলের রাজনীতির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
Source: Based on reporting from Iran International
