একে অপরকে পারমাণবিক স্থাপনার তথ্য দিলো ভারত-পাকিস্তান
দক্ষিণ এশিয়ার দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ভারত ও পাকিস্তান আবারও পারস্পরিক আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিল। বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) দুই দেশ একে অপরকে নিজ নিজ পারমাণবিক স্থাপনার অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য বিনিময় করেছে। একই সঙ্গে উভয় দেশের কারাগারে আটক বন্দিদের তালিকাও আদান-প্রদান করা হয়েছে। এই তথ্য বিনিময়কে দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে একটি উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম সামা নিউজ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় একই সময়ে এই দুই ধরনের তথ্য বিনিময় সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এটি কোনো নতুন সমঝোতা নয়; বরং বহু বছর আগে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ।
পারমাণবিক স্থাপনা সুরক্ষায় পুরোনো চুক্তি
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পারমাণবিক স্থাপনার তথ্য বিনিময় সংক্রান্ত চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয় ১৯৮৮ সালে। পাকিস্তানের পক্ষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো এবং ভারতের পক্ষে সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। পরের বছর থেকেই প্রতি বছর ১ জানুয়ারি উভয় দেশ একে অপরকে তাদের পারমাণবিক স্থাপনার তালিকা সরবরাহ করে আসছে।
এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল—যেকোনো সামরিক উত্তেজনা বা সংঘাতের সময় যাতে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে পারমাণবিক অবকাঠামোতে হামলা না হয়। একে অপরকে আগেই স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলোর অবস্থান জানিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ভারসাম্য বজায় রাখতে এই ব্যবস্থা এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বন্দি বিনিময়: মানবিক দিকটি গুরুত্ব পাচ্ছে
পারমাণবিক স্থাপনার পাশাপাশি ২০০৮ সালের আরেকটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী বন্দিদের তথ্যও বিনিময় করেছে ভারত ও পাকিস্তান। ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের কারাগারে কতজন পাকিস্তানি নাগরিক আটক আছেন। একইভাবে পাকিস্তানও জানিয়েছে, তাদের কারাগারে আটক ভারতীয় নাগরিকদের সংখ্যা।
সীমান্ত পেরিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রবেশ, মাছ ধরা বা ছোটখাটো অপরাধে গ্রেপ্তার হওয়া বন্দিদের দ্রুত চিহ্নিত ও মুক্তির ক্ষেত্রে এই তথ্য বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও নিয়মিত করার দাবি জানিয়ে আসছে।
উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক যোগাযোগ
এই তথ্য বিনিময়ের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারত–পাকিস্তান সম্পর্ক আবারও চাপে পড়েছিল। গত মে মাসে দুই দেশের মধ্যে চারদিনব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়, যা সীমান্ত উত্তেজনাকে নতুন করে সামনে আনে। সেই ঘটনার পর এটিই ছিল উচ্চপর্যায়ের উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক যোগাযোগ।
উল্লেখযোগ্যভাবে, পারমাণবিক অবকাঠামোর তথ্য বিনিময়ের আগে ঢাকায় এক প্রতীকী বৈঠকও হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জন্য প্রস্তুত শোক বইতে স্বাক্ষর করতে এসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং পাকিস্তানের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক সংক্ষিপ্ত বৈঠকে মিলিত হন। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সাক্ষাৎকার দক্ষিণ এশিয়ায় সংলাপ চালু রাখার ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্ব
বাংলাদেশের জন্য ভারত–পাকিস্তানের পারমাণবিক নিরাপত্তা ও সম্পর্কের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলের যেকোনো বড় ধরনের সংঘাতের প্রভাব সরাসরি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কূটনীতিতে পড়ে। তাই পারমাণবিক স্থাপনা সুরক্ষা এবং মানবিক ইস্যুতে তথ্য বিনিময়ের মতো উদ্যোগগুলোকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
শেষ কথা
দীর্ঘদিনের বৈরিতার মাঝেও চুক্তিভিত্তিক এই তথ্য বিনিময় দেখায়, ভারত ও পাকিস্তান এখনো কিছু ক্ষেত্রে সংলাপ ও আস্থার পথ খোলা রাখতে চায়। যদিও এতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মৌলিক সমস্যা মিটে যাবে—এমন আশা করা কঠিন, তবে পারমাণবিক ঝুঁকি কমানো ও মানবিক ইস্যুতে সহযোগিতা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
Source: Based on reporting from Dhaka Post and Sama News
