মেট্রোরেলের দুটি বিয়ারিং প্যাডই ছিল ত্রুটিপূর্ণ : তদন্ত কমিটি
রাজধানীর ব্যস্ত ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের পিলার থেকে খুলে পড়া দুটি বিয়ারিং প্যাডের মধ্যেই কাঠামোগত ত্রুটি ছিল বলে জানিয়েছে সরকার গঠিত তদন্ত কমিটি। একাধিক কারিগরি মানদণ্ড বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে কমিটি, যদিও তারা বলছে—এ থেকে পুরো মেট্রোরেল ব্যবস্থার সব বিয়ারিং প্যাড ত্রুটিপূর্ণ বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক ব্রিফিংয়ে তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ; সড়ক পরিবহন ও সেতু; এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।
কারিগরি পরীক্ষায় কী পাওয়া গেছে
তদন্ত কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, খুলে পড়া প্রতিটি বিয়ারিং প্যাডের ক্ষেত্রে ৮ থেকে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি প্যারামিটার যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি প্যারামিটারের মান প্রত্যাশিত মানদণ্ড পূরণ করেনি। এসব বিচ্যুতি থেকেই ধারণা করা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট বিয়ারিং প্যাড দুটিতে কাঠামোগত বা মানগত ত্রুটি ছিল।
তবে কমিটি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এই ফলাফলের ভিত্তিতে মেট্রোরেলের সব বিয়ারিং প্যাড ভালো বা খারাপ—এমন সার্বিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। প্রতিটি উপাদান আলাদাভাবে পরীক্ষা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলে তারা মত দিয়েছে।
নাশকতার প্রমাণ মেলেনি
দুর্ঘটনা নিয়ে জনমনে নাশকতার আশঙ্কা তৈরি হলেও তদন্ত কমিটি বলছে, এখন পর্যন্ত এমন কোনো তথ্য বা আলামত পাওয়া যায়নি যা ইচ্ছাকৃত নাশকতার ইঙ্গিত দেয়। তাদের মতে, প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে এটি কারিগরি ও মানগত সমস্যাজনিত ঘটনা বলেই প্রতীয়মান হয়েছে।
এই বক্তব্যে কিছুটা স্বস্তি পেলেও, নগরবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—বিশেষ করে রাজধানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মেট্রোরেলের অবকাঠামোগত নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে।
আগের দুটি ঘটনার পটভূমি
ফার্মগেটে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ার ঘটনা প্রথম ঘটে ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। সে সময় কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও, প্রায় ১১ ঘণ্টা মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। এতে অফিসগামী যাত্রীদের মধ্যে ভোগান্তি ও উদ্বেগ তৈরি হয়।
এর ঠিক এক মাসেরও কিছু বেশি সময় পর, ২৬ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে একই এলাকায় আবারও একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে। প্রায় ৮০ কেজি ওজনের ওই ভারী ধাতব বস্তু মাথায় পড়ে এক যুবকের মৃত্যু হয়। প্রাণঘাতী এই দুর্ঘটনার পর আবারও মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং ব্যাপক জনআলোচনার সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব
ঢাকার যানজট নিরসনে মেট্রোরেলকে অন্যতম প্রধান সমাধান হিসেবে দেখা হয়। প্রতিদিন লাখো মানুষ এই পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ফলে অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে সামান্য সন্দেহও নগর জীবনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু ত্রুটিপূর্ণ উপাদান শনাক্ত করাই নয়, বরং নিয়মিত মাননিয়ন্ত্রণ, তৃতীয় পক্ষের অডিট এবং স্বচ্ছ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাই ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে সহায়ক হবে।
শেষ কথা
তদন্ত কমিটির প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ফার্মগেটের দুটি দুর্ঘটনাই কারিগরি ত্রুটিজনিত হলেও এটি মেট্রোরেল ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্ক সংকেত। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।
Source: Based on reporting from Dhaka Post
