তাদের আগ্রহ না থাকলেও কিছু একটা করব, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্প
গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের বিষয়ে আবারও কঠোর ও আগ্রাসী অবস্থান নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের আপত্তি উপেক্ষা করে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আগ্রহ থাকুক বা না থাকুক—যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে ‘কিছু একটা করবেই’। তার এই বক্তব্য নতুন করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) হোয়াইট হাউসে তেল ও গ্যাস খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে এক বৈঠকে বক্তব্য দিতে গিয়ে ট্রাম্প এই হুঁশিয়ারি দেন। একই অনুষ্ঠানে তিনি ইরানে চলমান বিক্ষোভ দমন নিয়ে দেশটির সরকারকেও সরাসরি সতর্কবার্তা দেন।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কেন এত আগ্রহ
ট্রাম্প তার বক্তব্যে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে পদক্ষেপ না নেয়, তবে রাশিয়া কিংবা চীন অঞ্চলটি দখলে নিতে পারে। তার ভাষায়, “আমরা রাশিয়া বা চীনকে প্রতিবেশী হিসেবে চাই না।” তিনি যোগ করেন, গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, আর্কটিক অঞ্চলে বরফ গলতে থাকায় নতুন নৌপথ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও সামরিক সুবিধার সম্ভাবনা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে গ্রিনল্যান্ডের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব দ্রুত বেড়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র করছে।
ডেনমার্ক ও ন্যাটোর সঙ্গে উত্তেজনা
ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ন্যাটো মিত্রদের—বিশেষ করে ডেনমার্কের—সঙ্গে সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডেনমার্ক ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের অধিগ্রহণ প্রস্তাব স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক আগ্রাসন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য ভয়াবহ হুমকি হবে এবং ন্যাটোর অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলবে।
তবে ট্রাম্প তার বক্তব্যে ন্যাটোর প্রতি নিজের ভূমিকার কথা তুলে ধরে বলেন, “আমার জন্য না হলে আজ ন্যাটো থাকতই না।” একই সঙ্গে তিনি পুনরায় জোর দেন, যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড নিয়ে নিষ্ক্রিয় থাকবে না।
পুরোনো পরিকল্পনার পুনরাবৃত্তি
গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের ধারণা ট্রাম্প প্রথম প্রকাশ্যে তোলেন ২০১৯ সালে, তার প্রথম মেয়াদে। সে সময়ও ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের তীব্র বিরোধিতার মুখে প্রস্তাবটি স্থগিত হয়ে যায়। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আবারও বিষয়টি সামনে আনছেন তিনি, যা তার প্রশাসনের ক্রমবর্ধমান আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতিরই ইঙ্গিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গ্রিনল্যান্ড ও মার্কিন জনমত
গ্রিনল্যান্ডের জনগণ যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়ার ধারণা বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে। ২০২৫ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৮৫ শতাংশ গ্রিনল্যান্ডবাসী যুক্তরাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিপক্ষে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এই ধারণার প্রতি সমর্থন খুবই সীমিত—মাত্র ৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক গ্রিনল্যান্ডে সামরিক আগ্রাসন সমর্থন করেন বলে জরিপে উঠে এসেছে।
ইরান নিয়েও কড়া হুঁশিয়ারি
গ্রিনল্যান্ডের পাশাপাশি ইরানের চলমান বিক্ষোভ নিয়েও কঠোর বার্তা দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ইরান সরকার যদি বিক্ষোভ দমনে আবারও মানুষ হত্যায় জড়ায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে। তার ভাষায়, “গুলি ছোড়া শুরু করবেন না, কারণ তাহলে আমরাও গুলি ছোড়ব।”
ট্রাম্প ইরানকে ‘ভয়াবহ সমস্যায়’ থাকা একটি দেশ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র এমন জায়গায় আঘাত হানবে, যেখানে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশসহ বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব
ট্রাম্পের এসব বক্তব্য শুধু ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন অবস্থান আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং কূটনৈতিক সমাধানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও কূটনৈতিকভাবে ভারসাম্য রক্ষায় আগ্রহী দেশগুলোর জন্যও এসব বৈশ্বিক উত্তেজনা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের বিষয়।
Source: Based on reporting from The Guardian
