বিয়ের গেটেও উঠল হাদি হত্যার বিচার দাবি
বাংলাদেশে সামাজিক প্রতিবাদের নতুন এক দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে কুড়িগ্রামে। বিয়ের মতো ব্যক্তিগত ও আনন্দঘন অনুষ্ঠানের মাঝেও উঠে এসেছে একটি জাতীয় দাবির প্রতিধ্বনি—শরীফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী ইউনিয়নে অনুষ্ঠিত একটি বিয়েতে বরযাত্রীরা হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে ন্যায়বিচারের আহ্বান জানান, যা স্থানীয়ভাবে যেমন প্রশংসা কুড়িয়েছে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর)। গ্লোবাল টেলিভিশনের রিপোর্টার জাকির হোসেনের সঙ্গে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাটেশ্বরী এলাকার নুসরাত জাহান নীলার বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা চলাকালে এই ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ চোখে পড়ে। নির্ধারিত সময় বরযাত্রীরা কনের বাড়িতে পৌঁছালে দেখা যায়, প্রচলিত বিয়ের গেটের হাসি-ঠাট্টা বা দরকষাকষির বদলে তাঁদের হাতে রয়েছে লেখা—‘হাদি হত্যার বিচার চাই’ ও ‘জাস্টিস ফর হাদি’।
প্রতিবাদের ভিন্ন ভাষা
বরযাত্রী কল্লোল রায় বলেন, শরীফ ওসমান হাদি ছিলেন দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর। তাঁর মতে, “এই হত্যার বিচার না হলে ভবিষ্যতে এমন সাহসী কণ্ঠ আর গড়ে উঠবে না।” তিনি জানান, বন্ধুর বিয়ের মতো আনন্দের মুহূর্তকে বেছে নেওয়া হয়েছে এই বার্তাটি সমাজের সব স্তরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
কৃষক নেতা জুয়েলও একই সুরে কথা বলেন। তাঁর ভাষায়, বিয়ে মানুষের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই মুহূর্ত থেকেই অন্যায় ও অনিশ্চিত মৃত্যুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশার প্রকাশ।
বরের কণ্ঠে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা
বর জাকির হোসেন নিজেও এই উদ্যোগের ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান দেশের মানুষের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনার জন্ম দিয়েছে। সেই অভ্যুত্থানের অন্যতম অগ্রনায়ক হিসেবে পরিচিত ছিলেন শরীফ ওসমান হাদি। জাকিরের অভিযোগ, ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সরব থাকার কারণেই হাদিকে হত্যা করা হয়েছে, অথচ এখনো তাঁর হত্যার বিচার সম্পন্ন হয়নি।
তিনি আরও বলেন, “আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনে দাঁড়িয়ে আমি ন্যায়বিচারের দাবি জানাতে চেয়েছি। ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশে হাদি ভাইয়ের হত্যার বিচার জনগণ যেন দেখতে পায়—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব
এই ব্যতিক্রমী প্রতিবাদের ছবি ও ভিডিও দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অনেকেই এই উদ্যোগকে সাহসী ও সময়োপযোগী বলে মন্তব্য করেন। স্থানীয়দের মতে, বিয়ের মতো আনন্দঘন অনুষ্ঠানে এমন প্রতিবাদ দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ন্যায়বিচারের দাবি শুধু মিছিল বা সমাবেশেই সীমাবদ্ধ নয়—ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তেও তা উচ্চারিত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এই ধরনের প্রতীকী প্রতিবাদ দেশের চলমান বিচারহীনতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে আনছে। বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে এটি একটি বার্তা দিচ্ছে যে, সামাজিক দায়িত্ব পালনের জন্য আলাদা কোনো মঞ্চের প্রয়োজন নেই; সচেতনতা ও সাহস থাকলেই প্রতিবাদের ভাষা তৈরি হয়।
সব মিলিয়ে, কুড়িগ্রামের এই বিয়ে শুধু দুটি মানুষের নতুন জীবনের সূচনা নয়, বরং ন্যায়বিচারের দাবিতে একটি সামাজিক বার্তার বাহক হয়ে উঠেছে—যা হয়তো দীর্ঘদিন মানুষের মনে আলোড়ন তুলবে।
Source: Based on reporting from Amardesh
