ব্যবসায়ীদের কাছে রাজনীতিবিদদের যেতে হবে: আমীর খসরু

ব্যবসা ও রাজনীতির সম্পর্কের প্রচলিত ধারা বদলানোর আহ্বান জানিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ব্যবসায়ীদের কাছে রাজনীতিবিদদের যেতে হবে। তাঁর মতে, সরকারের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কোনো রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে না; বরং জনগণ ও অর্থনৈতিক খাতের হাতে ক্ষমতা থাকলেই একটি টেকসই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠে।

সোমবার সকালে চট্টগ্রাম নগরের রেডিসন ব্লু হোটেলের মেজবান হলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যবসায়ী ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাণিজ্য সংলাপ’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এই সংলাপে চট্টগ্রাম ও আশপাশের জেলার শীর্ষ ব্যবসায়ী, শিল্প উদ্যোক্তা ও বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

গণতন্ত্র ও অর্থনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য

আমীর খসরু বলেন, গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের ক্ষমতার মাধ্যমে সরকারের ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা। শুধু রাজনৈতিক কাঠামোয় গণতন্ত্র থাকলেই রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হয় না; অর্থনীতি, ব্যবসা ও সামাজিক ক্ষেত্রেও গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করতে হয়। তিনি বলেন, বিএনপি এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে জনগণের ক্ষমতার ভিত্তিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।

তার বক্তব্যে ‘সিস্টেমিক ডি-রেভুলেশন’-এর বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, দুর্নীতিবাজদের হাতে জমে থাকা ক্ষমতা ভেঙে দিতে হবে। এজন্য প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় সংস্কার জরুরি, যাতে ব্যবসা পরিচালনায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার কমে আসে।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে আমীর খসরু জানান, গত ছয় মাস ধরে দেশের বিভিন্ন বিভাগে এ ধরনের সংলাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চট্টগ্রামের পর কেবল ঢাকায় এই সংলাপ আয়োজন বাকি রয়েছে। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ীরা নানা সমস্যার সমাধানে রাজনীতিবিদ বা মন্ত্রীদের দ্বারস্থ হয়েছেন, কিন্তু এই সংস্কৃতি বদলাতে চান তাঁরা।

তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হলো রাজনীতিবিদরা ব্যবসায়ীদের কাছে আসবেন, তাঁদের কথা শুনবেন এবং নীতিনির্ধারণে সেই মতামতের প্রতিফলন ঘটাবেন।”

আমদানি-রপ্তানি ও অটোমেশনের পরিকল্পনা

সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু আমদানি ও রপ্তানি খাতের সংস্কারের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের সক্ষমতা বাড়াতে তাদের হাতে বাস্তব ক্ষমতা দিতে হবে। ভবিষ্যতে রপ্তানিকারকদের জন্য ব্যাক-টু-ব্যাক সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

একই সঙ্গে বন্দরের কার্যক্রম, কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও বিভিন্ন অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অটোমেশন চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তাঁর মতে, একটি সুপারভাইজারি কমিটির মাধ্যমে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করা গেলে সময় ও খরচ দুটোই কমবে, যা সরাসরি ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব ও প্রত্যাশা

অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীরা নিজ নিজ খাতের সমস্যার কথা তুলে ধরেন। বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান বলেন, চট্টগ্রামে আরও ইপিজেড প্রয়োজন। ইপিজেড সম্প্রসারণ হলে শিল্পায়ন বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কফিল উদ্দিন দক্ষ চালকের ঘাটতির কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে উল্লেখ করে প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেন। চিটাগং উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহসভাপতি সুলতানা নূরজাহান রোজি বলেন, জামানতবিহীন ঋণ ও প্রশিক্ষণ সুবিধা বাড়লে নারী উদ্যোক্তারা আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারবেন।

এশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ সালাম, বারভিডার সাবেক মহাসচিব মো. হাবিবুর রহমানসহ অন্যান্য বক্তারা ব্যবসা সহজীকরণ, চট্টগ্রাম বন্দরকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা এবং নীতিনির্ধারণে ব্যবসায়ীদের মতামত অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।

উপসংহার

চট্টগ্রামের এই বাণিজ্য সংলাপ স্পষ্ট করেছে যে, রাজনীতি ও ব্যবসার মধ্যে সরাসরি ও কার্যকর যোগাযোগ ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমীর খসরুর বক্তব্যে উঠে আসা ক্ষমতার ভারসাম্য, অটোমেশন ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের প্রশ্নগুলো আগামী দিনের অর্থনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

Source: Based on reporting from Dhaka Post

Next Post Previous Post

Advertisement