অশ্রুজলে শায়িত হাদি, ন্যায়বিচার দাবিতে উত্তাল শাহবাগ
ঢাকার শাহবাগ শনিবার বিকেলে পরিণত হয় শোক, ক্ষোভ এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার মানুষের এক আবেগঘন মিলনস্থলে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির দাফন সম্পন্ন হওয়ার পরপরই শাহবাগ ও আশপাশের এলাকায় জড়ো হন হাজারো মানুষ। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তারা হাদির হত্যার বিচার এবং দায়ীদের দ্রুত বিচারের দাবিতে স্লোগানে মুখর করে তোলেন রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই মোড়।
রাজধানী ঢাকা, শাহবাগ, ইনকিলাব মঞ্চ, শহীদ হাদি—এই শব্দগুলো শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথ পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে। দুপুরে জানাজা শেষে বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দাফনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় হাদির পার্থিব অধ্যায়, তবে শুরু হয় ন্যায়বিচারের দাবিতে নতুন অধ্যায়।
লাখো মানুষের অংশগ্রহণে জানাজা
শনিবার সকাল থেকেই জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকায় মানুষের ঢল নামে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মানুষ হাদির জানাজায় অংশ নিতে জড়ো হন। দুপুর আড়াইটার দিকে তার বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিকের ইমামতিতে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার আগে বক্তব্য দেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা।
এ সময় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি জানাজার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তোলে। অনেকেই হাদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ হিসেবে উল্লেখ করে তার অবদান স্মরণ করেন।
নজরুলের পাশে চিরনিদ্রা
জানাজা শেষে হাদির মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি চত্বরে। বিকেল সোয়া তিনটার দিকে সেখানে তাকে দাফন করা হয়। ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই স্থানে দাফনকে অনেকেই প্রতীকী সম্মান হিসেবে দেখছেন।
দাফনের পরপরই শাহবাগ এলাকায় মানুষের ঢল নামে। যদিও নিরাপত্তার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যারিকেড দিয়ে সমাধিস্থলের আশপাশ ঘিরে রাখে, তবু শাহবাগ চত্বরে অবস্থান নেন হাজারো মানুষ।
ন্যায়বিচারের দাবিতে উত্তাল শাহবাগ
“শহীদ হাদির বিচার চাই”, “খুনিদের শাস্তি দিতে হবে”—এমন নানা স্লোগানে শাহবাগ ও আশপাশের এলাকা উত্তাল হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। অনেকেই বলেন, হাদির হত্যার বিচার না হলে এটি শুধু একজন ব্যক্তির নয়, পুরো আন্দোলনের ওপর আঘাত হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শাহবাগ ও আশপাশের এলাকায় সতর্ক অবস্থানে থাকলেও বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। ইনকিলাব মঞ্চের নেতারা জানিয়েছেন, জানাজা ও দাফন শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিক্রিয়া
বিশ্লেষকদের মতে, হাদির মৃত্যু ও দাফনের পর শাহবাগে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। এটি শুধু শোক নয়, বরং জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের প্রতি জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। আগামী দিনে এই দাবিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে আরও আলোচনা ও কর্মসূচি দেখা যেতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
শোক আর প্রতিবাদের এই দিনটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—একজন মানুষের জীবন থেমে গেলেও তার দাবি ও আদর্শ বহু মানুষের কণ্ঠে বেঁচে থাকতে পারে।
Source: Based on reporting from Dhaka Post
