জামায়াত আমাকে আশ্রয় না দিলে রাস্তায় পড়ে থাকতে হতো

রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন ও ব্যক্তিগত সংকটের কথা প্রকাশ্যে তুলে ধরে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সদ্য জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেওয়া মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান রঞ্জন বলেছেন, জামায়াত তাকে আশ্রয় না দিলে হয়তো আজ তিনি রাস্তায় পড়ে থাকতেন। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে আয়োজিত এক কৈফিয়ত সভায় দেওয়া এই বক্তব্য স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

শনিবার (২০ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় কটিয়াদী উপজেলার গচিহাটা কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত ওই সভায় তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী তাকে শুধু রাজনৈতিক নয়, মানবিক আশ্রয়ও দিয়েছে। এ কারণে তিনি দলটির প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবেন বলে জানান।

জামায়াতের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও আবেগঘন বক্তব্য

সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মেজর রঞ্জন বলেন, “যে কথায় জামায়াতে ইসলামী কষ্ট পায়, সে কথা আমি আর বলবো না। প্রয়োজনে আমার জবান কেটে দেব।” তার ভাষায়, এই বয়সে নতুন করে ঘর বা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার সামর্থ্য তার নেই। “আমার ঘরে চাল নেই, চুলা নেই—আমি কীভাবে নতুন ঘর বানাবো?”—এমন প্রশ্ন তুলে ধরে তিনি বলেন, জামায়াত তাকে সেই সংকট থেকে রক্ষা করেছে।

তার এই বক্তব্য সভায় উপস্থিত নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে আবেগের সৃষ্টি করে। অনেকেই এটিকে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি একজন প্রবীণ রাজনীতিকের ব্যক্তিগত হতাশা ও নির্ভরতার প্রকাশ হিসেবে দেখছেন।

বিএনপি ছাড়ার প্রেক্ষাপট ও আত্মপক্ষ সমর্থন

নিজের রাজনৈতিক অতীত নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মেজর রঞ্জন বলেন, তিনি স্বেচ্ছায় বিএনপি ছেড়ে আসেননি। বরং দীর্ঘ তিন বছর তাকে দল থেকে কার্যত দূরে রাখা হয়েছে। তার অভিযোগ, এ সময় বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি, এমনকি পারিবারিক অনুষ্ঠানেও আমন্ত্রণ জানাননি।

তিনি বলেন, “আজ হঠাৎ করে দেখছি আমার দাম বেড়ে গেছে। ফেসবুকে আমাকে নিয়ে অনেক লেখালেখি হচ্ছে।” সমালোচনাকেও তিনি ইতিবাচকভাবে দেখছেন বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, এতেই বোঝা যায়—তাকে নিয়ে এখনো ভাবা হচ্ছে।

নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা

নির্বাচন প্রসঙ্গে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়ে মেজর রঞ্জন বলেন, তিনি আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেবেন না। তবে জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে দলটি নিশ্চয়ই তাকে উপযুক্ত কোনো দায়িত্ব দেবে—এমন প্রত্যাশার কথাও জানান।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত, যেখানে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতি থেকে সরে এসে নীতিগত ও আদর্শিক অবস্থানকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলছেন।

জামায়াতের কাছে তিন দাবি

কৈফিয়ত সভায় মেজর রঞ্জন জামায়াতে ইসলামীর কাছে তিনটি আবদার তুলে ধরেন। প্রথমত, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দখলদারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান। দ্বিতীয়ত, বিশৃঙ্খলা নয়—সত্য প্রকাশ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলাম কায়েমের কথা বলেন। তৃতীয়ত, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন, যেখানে মানুষ মানুষকে সম্মান করবে।

শরিফ ওসমান হাদির হত্যার বিচার দাবি

সভায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির হত্যার প্রসঙ্গ তুলে মেজর রঞ্জন তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বলেন, একজন ত্যাগী নেতাকে হারিয়েছে দেশ। তার দাবি, হত্যার সঙ্গে জড়িতদের যেখানেই থাকুক, আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। একই সঙ্গে শহীদ হাদির রেখে যাওয়া কাজ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেন তিনি।

সভায় জামায়াতে ইসলামীর কিশোরগঞ্জ-২ আসনের মনোনীত প্রার্থী মাওলানা শফিকুল ইসলাম মোড়লসহ স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে সভা শেষে শরিফ ওসমান হাদির রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।

Source: Based on reporting from Dhaka Post

Next Post Previous Post

Advertisement