পাকিস্তানের স্পিকারের কাছে এগিয়ে গিয়ে কথা বলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় জড়ো হন বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা। সেই আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তের সাক্ষী হয় রাজধানী। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিকের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময়ে এগিয়ে যান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর—এমন একটি ঘটনা বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়।

একাধিক ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, শোক বইয়ে স্বাক্ষরের পর দুই নেতা পরস্পরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কথা বলছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক তীব্র উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই সাক্ষাৎকে প্রতীকী গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

কীভাবে শুরু হয় কথোপকথন

পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের অফিসিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টের তথ্যে বলা হয়, শোক বইয়ে বার্তা লেখার আনুষ্ঠানিকতা শেষে এস জয়শঙ্কর নিজ উদ্যোগে স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিকের কাছে যান। তখন তিনি পরিচয় দিয়ে বলেন, “আপনাকে আমি চিনতে পেরেছি।” এরপর দুজনের মধ্যে সংক্ষিপ্ত আলাপ হয় এবং তারা হাত মেলান।

এই মুহূর্তটি উপস্থিত কূটনীতিক ও প্রতিনিধিদের নজর কাড়ে। কারণ, কয়েক মাস আগেই দুই দেশের মধ্যে ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর এটি ছিল দৃশ্যমান কোনো উচ্চপর্যায়ের সৌজন্য বিনিময়।

পটভূমি: উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক

চলতি বছরের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে টানা চার দিন ধরে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়, যাতে উভয় পক্ষেই প্রাণহানি ঘটে। সেই ঘটনার পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। যোগাযোগের পথ সংকুচিত হয় এবং পারস্পরিক বক্তব্যে কঠোরতা বাড়ে।

এই বাস্তবতায় ঢাকায় দুই দেশের শীর্ষ প্রতিনিধির মুখোমুখি হওয়া স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। যদিও এটি কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক ছিল না, তবু কূটনৈতিক ভাষায় এমন সৌজন্য বিনিময়কে অনেক সময় ‘আইস ব্রেকার’ হিসেবে দেখা হয়।

পাকিস্তানের সংসদের বক্তব্য

পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের উপস্থিতিতে এই সৌজন্য বিনিময় ঘটে। বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের মে মাসের সংঘাতের পর এটি ছিল ভারতের পক্ষ থেকে প্রথম কোনো উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ।

পাকিস্তানের সংসদ দাবি করেছে, উত্তেজনা কমাতে তারা বরাবরই সংযম, সংলাপ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্কের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এর মধ্যে শান্তি আলোচনা এবং বিতর্কিত ঘটনার যৌথ তদন্তের প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে বিবৃতিতে বলা হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঘটনাটির গুরুত্ব

ঢাকায় আয়োজিত শোকানুষ্ঠানে এই সাক্ষাৎ হওয়ায় বাংলাদেশও অনিচ্ছাকৃতভাবে আঞ্চলিক কূটনীতির এক সংবেদনশীল মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে ওঠে। বিশ্লেষকদের মতে, তৃতীয় দেশে, বিশেষ করে একটি শোকানুষ্ঠানের মতো অরাজনৈতিক পরিসরে এমন যোগাযোগ ভবিষ্যতে সংলাপের পথ খুলে দিতে পারে।

বাংলাদেশের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সংলাপের পক্ষে কথা বলে আসছে। ঢাকায় এই সৌজন্য বিনিময় সেই বার্তাকেই আরও দৃশ্যমান করেছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

প্রতীকী হলেও বার্তাবহ

যদিও এই সাক্ষাৎ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি, তবু কূটনৈতিক মহলে একে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা হিসেবেও দেখা হচ্ছে না। দক্ষিণ এশিয়ার জটিল রাজনীতিতে অনেক সময় এমন ছোট ইঙ্গিতই ভবিষ্যৎ যোগাযোগের ভিত্তি তৈরি করে।

সব মিলিয়ে, ঢাকায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পাকিস্তানের স্পিকারের এই অপ্রত্যাশিত সৌজন্য বিনিময় আঞ্চলিক কূটনীতিতে একটি প্রতীকী কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেই আলোচিত হচ্ছে।

Source: Based on reporting from Dhaka Post

Next Post Previous Post

Advertisement